...

পিতৃস্নেহের অমর গাঁথা: 'জীবন-বিনিময়' কবিতার বিশ্লেষণ ।


পিতৃস্নেহের অমর গাঁথা: 'জীবন-বিনিময়' কবিতার বিশ্লেষণ।

'জীবন-বিনিময়' কবিতার বিশ্লেষণ ।
কবি গোলাম মোস্তফার ‘জীবন-বিনিময়’ কবিতাটি মোগল সম্রাট বাবরের মহান পিতৃস্নেহ এবং ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মরণাপন্ন পুত্র হুমায়ুনের জীবন বাঁচাতে একজন পিতা কীভাবে নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বিধাতার কাছে উৎসর্গ করেছিলেন, কবি অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় তা এখানে চিত্রিত করেছেন। ঐতিহাসিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে রচিত এই কবিতাটি সন্তানের প্রতি মা-বাবার অসীম ভালোবাসার এক শাশ্বত দলিল। আজ আমরা এই কবিতার মূলভাব ও প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করলাম। আমাদের আগামী ক্লাসে এই কবিতার ওপর ভিত্তি করে সম্ভাব্য সকল সৃজনশীল এবং বহুনির্বচনীয় (MCQ) প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

শব্দের অর্থ

"বাদশা বাবর কাঁদিয়া ফিরিছে, নিদ নাহি চোখে তাঁর-" এই লাইনটির প্রতিটি শব্দের অর্থ নিচে দেওয়া হলো:

শব্দ

আধুনিক বা প্রচলিত অর্থ

কবিতার প্রেক্ষাপটে অর্থ

বাদশা

রাজা, সম্রাট, শাসক

সম্রাট বাবর।

বাবর

প্রথম মুঘল সম্রাট জহিরউদ্দিন মুহম্মদ বাবর (ব্যক্তি নাম)

প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর।

কাঁদিয়া

ক্রন্দন করে, কান্নাকাটি করে।

চোখের জল ফেলে, অত্যন্ত দুঃখে।

ফিরিছে

ঘুরছে, পায়চারি করছে, ঘোরাফেরা করছে।

অস্থিরভাবে ঘুরছেন, স্থির থাকতে পারছেন না।

নিদ

ঘুম, নিদ্রা।

চোখে ঘুম বা বিশ্রাম।

নাহি

নেই, নাই।

অনুপস্থিত।

চোখে

দৃষ্টি অঙ্গে, নয়নে।

তাঁর নয়নে, তাঁর দৃষ্টিতে।

তাঁর

তাঁর (সম্মানসূচক), রাজার।

বাবর-এর।

 

"পুত্র তাঁহার হুনায়ন বুঝি বাঁচে না এবার আর!

চারিধারে তার ঘনায়ে আসিছে মরন-অন্ধকার।"—

এই লাইন দুটির প্রতিটি শব্দের অর্থ নিচে দেওয়া হলো:

শব্দ

আধুনিক বা প্রচলিত অর্থ

কবিতার প্রেক্ষাপটে অর্থ

পুত্র

ছেলে, সন্তান।

বাবরের ছেলে, অর্থাৎ হুমায়ুন।

তাঁহার

তাঁর (সম্মানসূচক)

বাবরের।

হুনায়ন

মুঘল সম্রাট হুমায়ুন (বাবরের পুত্র)

সম্রাট হুমায়ুন (অসুস্থ রাজপুত্র)

বুঝি

মনে হয়, হয়তো, সম্ভবত।

বাবর সন্দেহ করছেন, অনুমান করছেন।

বাঁচে না

জীবিত থাকবে না, রক্ষা পাবে না।

মারা যাবে, জীবন থাকবে না।

এবার

এই সময়, এই পরিস্থিতিতে।

এই অসুস্থতার কারণে।

আর

আর, আর বেশি নয়, এখন থেকে।

আর বাঁচবে না।

চারিধারে

চারদিকে, আশেপাশে, চারপাশে।

পুত্রের চারিদিকে।

তার

তাঁর (এই ক্ষেত্রে হুমায়ুনের)

হুমায়ুনের।

ঘনায়ে

জমা হয়ে, ঘন হয়ে, এগিয়ে এসে।

ক্রমশ ঘিরে আসছে বা ছেয়ে যাচ্ছে।

আসিছে

আসছে, আগমন করছে।

ঘনীভূত হচ্ছে।

মরন-অন্ধকার

মৃত্যুর অন্ধকার (একটি রূপক শব্দ)

মৃত্যু, জীবনের সমাপ্তি, নিরাশা।

 

"রাজ্যের যত বিজ্ঞ হেকিম কবিরাজ দরবেশ /

এসেছে সবাই, দিতেছে বসিয়া ব্যবস্থা সবিশেষ, /

সেবাযত্নের বিধিবিধানের ত্রুটি নাহি এক লেশ।"

 

শব্দ

আধুনিক বা প্রচলিত অর্থ

কবিতার প্রেক্ষাপটে অর্থ

রাজ্যের

দেশের বা রাজ্যের (এই ক্ষেত্রে মুঘল সাম্রাজ্যের)

বাদশাহর সাম্রাজ্যের অন্তর্গত।

বিজ্ঞ

জ্ঞানী, পণ্ডিত, বিচক্ষণ।

অভিজ্ঞ সেরা।

হেকিম

ইউনানি পদ্ধতির চিকিৎসক।

প্রাচীন বা দেশীয় চিকিৎসক।

কবিরাজ

আয়ুর্বেদিক বা দেশীয় পদ্ধতির চিকিৎসক।

অভিজ্ঞ শাস্ত্রজ্ঞ বৈদ্য।

দরবেশ

ধার্মিক ব্যক্তি, ফকির বা সন্ন্যাসী।

যারা আধ্যাত্মিক শক্তি দিয়ে আরোগ্য লাভের জন্য প্রার্থনা করেন।

সবিশেষ

বিস্তারিত, বিশেষ রূপে, খুঁটিনাটি সহ।

রোগের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত খুঁটিনাটি ব্যবস্থা।

দিতেছে বসিয়া

বসে বসে দিচ্ছে/প্রদান করছে।

বসে স্থিরভাবে (সময় নিয়ে) পরামর্শ বা চিকিৎসা পদ্ধতি দিচ্ছে।

ব্যবস্থা

উপায়, বিধান, চিকিৎসার পদ্ধতি।

রোগের প্রতিকারের উপায় বা চিকিৎসার পরিকল্পনা।

সেবাযত্নের

সেবা পরিচর্যার।

অসুস্থ হুমায়ুনের দেখভাল বা পরিচর্যার।

বিধিবিধানের

নিয়ম-কানুন, আইন বা প্রণালী।

সেবাযত্ন বা চিকিৎসার নিয়মের।

ত্রুটি

ভুল, খুঁত, কমতি, দোষ।

কোনো ধরনের অভাব বা অবহেলা।

নাহি এক লেশ

সামান্যতমও নেই।

বিন্দুমাত্র ত্রুটি বা কমতি নেই।


"তবু তাঁর সেই দুরন্ত রোগ হটিতেসে নাকো হায়, /

যত দিন যায়, দুর্ভোগ তার ততই বারিয়া যায়— /

জীবন-প্রদীপ নিভিয়া আসিছে অস্তরবির প্রায়।"

 

শব্দ

অর্থ

তবু

তারপরও, সত্ত্বেও, তবুও।

দুরন্ত

প্রচণ্ড, কঠিন, দমন করা কঠিন এমন। (এখানে রোগের তীব্রতাকে বোঝাচ্ছে)

রোগ

অসুখ, ব্যাধি, অসুস্থতা।

হটিতেসে নাকো

সরে যাচ্ছে না, দূর হচ্ছে না, সারছে না। (প্রাচীন বা কাব্যিক রূপ)

হায়

আক্ষেপ বা দুঃখ প্রকাশের অব্যয়।

দুর্ভোগ

কষ্ট, দুর্দশা, ভোগান্তি।

ততই বারিয়া যায়

তত বেশি বেড়ে যায়, ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

জীবন-প্রদীপ

জীবনকে প্রদীপের শিখার সাথে তুলনা করা হয়েছে; জীবনের আলো, প্রাণ।

নিভিয়া আসিছে

নিভে আসছে, শেষ হতে চলেছে।

অস্তরবির প্রায়

অস্তগামী সূর্যের মতো, অর্থাৎ সূর্য যেমন ডুবে যায়, তেমনি জীবনও শেষ হয়ে যাচ্ছে।

 

"শুধাল বাবর ব্যগ্রকন্ঠে ভিষকব্রিন্দে ডাকি, /

বলো বলো আজি সত্যি করিয়া, দিও নাকো মোরে ফাঁকি, /

এই রোগ হতে বাদশাজাদার মুক্তি মিলিবে নাকি?”

 

শব্দ

অর্থ

শুধাল

জিজ্ঞাসা করল, জানতে চাইল।

ব্যগ্রকন্ঠে

ব্যাকুল বা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে, অত্যন্ত আগ্রহের সাথে।

ভিষকব্রিন্দে

চিকিৎসকবৃন্দকে, ডাক্তারদের দলকে। ('ভিষক' অর্থ চিকিৎসক এবং 'বৃন্দ' অর্থ দল)

আজি

আজ, এই দিনে।

ফাঁকি

প্রতারণা, মিথ্যা কথা, ছলনা।

বাদশাজাদার

বাদশাহের পুত্রের, যুবরাজের। (এখানে হুমায়ুনের কথা বলা হয়েছে)

মুক্তি মিলিবে

মুক্তি পাওয়া যাবে, নিস্তার পাওয়া যাবে, আরোগ্য লাভ হবে।

নাকি

কিনা, কি না (প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার জন্য ব্যবহৃত হয়)

 

"নতমস্তকে রহিল সবাই, কহিল না কোনো কথা, /

মুখর হইয়া উঠিল তাঁদের সে নিষ্ঠুর নীরবতা /

শেলসম আসি বাবরের বুকে বিঁধিল কিসের ব্যাথা!"

 

শব্দ

অর্থ

নতমস্তকে

মাথা নিচু করে, বিনয়ের সাথে বা হতাশার কারণে মাথা ঝুঁকে।

রহিল সবাই

সবাই রইল, অর্থাৎ সবাই সেইভাবে (মাথা নিচু করে) থাকল।

কহিল না

বলল না, মুখ খুলল না।

মুখর হইয়া উঠিল

সরব হয়ে উঠল, জোরে উচ্চারিত হলো বা প্রকাশিত হলো। (এখানে নীরবতাই কথা হয়ে উঠল)

নিষ্ঠুর

নির্মম, অত্যন্ত কঠিন, হৃদয়হীন।

নীরবতা

চুপ থাকা, কোনো কথা না বলা।

শেলসম

শেলের মতো, তীরের মতো, (তীব্র আঘাতকারী অস্ত্রের মতো)

আসি

এসে।

বিঁধিল

গেঁথে গেল, আঘাত করল।

ব্যাথা

বেদনা, কষ্ট, যন্ত্রণা।

 

"হেনকালে এক দরবেশ উঠি কহিলেন—‘সুলতান,

সবচেয়ে তব শ্রেষ্ট যে-ধন দিতে যদি পার দান,

খুশি হয়ে তবে বাঁচাবে আল্লা বাদশাজাদার প্রান।’"

 

শব্দ

অর্থ

হেনকালে

এই সময়ে, এমন সময়।

দরবেশ

সাধু, ফকির, ধার্মিক ব্যক্তি বা সন্ন্যাসী।

উঠি কহিলেন

উঠে দাঁড়িয়ে বললেন।

সুলতান

রাজা, শাসক, সম্রাট (এখানে বাবরকে সম্বোধন করা হয়েছে)

সবচেয়ে তব শ্রেষ্ঠ যে-ধন

তোমার (তব) সবথেকে দামি সম্পদ বা মূল্যবান জিনিস।

দিতে যদি পার দান

যদি তুমি দান করতে পারো বা উৎসর্গ করতে পারো।

খুশি হয়ে

সন্তুষ্ট হয়ে।

আল্লা

ঈশ্বর, আল্লাহ (স্রষ্টা)

বাদশাজাদার প্রাণ

বাদশাহের পুত্রের জীবন।

 

"শুনিয়া সে কথা কহিল বাবর শঙ্কা নাহিক মানি- /

তাই যদি হয়, প্রস্তুত আমি দিতে সেই কোরবানি, /

সবচেয়ে মোর শ্রেষ্ঠ যে ধন জানি তাহা আমি জানি।

 

শব্দ

অর্থ

শুনিয়া সে কথা

সেই কথাটি শুনে।

কহিল বাবর

বাবর বললেন।

শঙ্কা

ভয়, দ্বিধা, সংশয়।

নাহিক মানি

মানি না, গ্রাহ্য করি না, পরোয়া করি না।

তাই যদি হয়

যদি তাই হয়, যদি এটাই শর্ত হয়।

প্রস্তুত আমি

আমি তৈরি, আমি রাজি।

কোরবানি

আত্মত্যাগ, উৎসর্গ, দান (এখানে জীবনের বিনিময়ে দান বোঝানো হয়েছে)

সবচেয়ে মোর শ্রেষ্ঠ যে ধন

আমার (মোর) সবথেকে মূল্যবান সম্পদ।

জানি তাহা আমি জানি

আমি সেটি জানি, অর্থাৎ কী দান করতে হবে সে বিষয়ে তার স্পষ্ট ধারণা আছে।

 

"এতেক বলিয়া আসন পাতিয়া নিরিবিলি গৃহতল

গভীর ধেয়ানে বসিল বাবর শান্ত অচঞ্চল,

প্রার্থনারত হাতদুটি তাঁর, নয়নে অশ্রু জল।"

 

শব্দ

অর্থ

এতেক বলিয়া

এতটুকু বলে, এই কথা বলে।

আসন পাতিয়া

বসার স্থান তৈরি করে, বসার জন্য মাদুর বা কিছু বিছিয়ে।

নিরিবিলি

নির্জন, নিস্তব্ধ, শান্ত।

গৃহতল

ঘরের মেঝে বা ভিতরের অংশ।

গভীর ধেয়ানে

গভীর ধ্যানে, গভীর চিন্তায় বা প্রার্থনায় মগ্ন হয়ে।

বসিল বাবর

বাবর বসলেন।

শান্ত অচঞ্চল

শান্ত এবং স্থির, কোনো প্রকার নড়াচড়া বা উদ্বেগহীন।

প্রার্থনারত

প্রার্থনা করছে এমন, হাতজোড় করে বা বিশেষ ভঙ্গিতে।

নয়নে অশ্রু জল

চোখে অশ্রু বা চোখের জল।

 

কহিল কাঁদিয়া- ‘হে দয়াল খোদা, হে রহিম রহমান,

মোর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় আমারি আপন প্রাণ,

তাই নিয়ে প্রভু পুত্রের প্রান কর মোরে প্রতিদান।

 

শব্দ

অর্থ

কহিল কাঁদিয়া

কেঁদে কেঁদে বললেন।

দয়াল খোদা

করুণাময় ঈশ্বর, দয়ালু সৃষ্টিকর্তা।

রহিম রহমান

আল্লাহ্ দুটি গুণবাচক নাম, যার অর্থ পরম করুণাময় দয়াবান।

মোর জীবনের সবচেয়ে প্রিয়

আমার (মোর) জীবনের সবথেকে মূল্যবান/আকর্ষণীয়।

আমারি আপন প্রাণ

আমার নিজের জীবন, আমার সত্তা।

তাই নিয়ে প্রভু

সেটাই গ্রহণ করে বা তার বিনিময়ে, হে ঈশ্বর।

পুত্রের প্রাণ

সন্তানের জীবন।

কর মোরে প্রতিদান

আমাকে প্রতিদান স্বরূপ দাও, আমার পুত্রের জীবন বাঁচাও।

 

স্তব্ধ-নীরব গৃহতল, মুখে নাহি তার বাণী,

গভীর রজনী, সুপ্তি-মগন নিখিল বিশ্বরাণী,

আকাশে বাতাসে ধ্বনিতেছে যেন গোপন কী কানাকানি।

 

শব্দ

অর্থ

স্তব্ধ-নীরব

সম্পূর্ণ চুপচাপ, একেবারে নীরব নিস্তব্ধ।

গৃহতল

ঘরের মেঝে বা ভিতরের অংশ।

মুখে নাহি তার বাণী

তাঁর মুখে কোনো কথা নেই।

গভীর রজনী

গভীর রাত, মাঝরাত।

সুপ্তি-মগন

ঘুমে মগ্ন, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

নিখিল

সমগ্র, সমস্ত, গোটা।

বিশ্বরাণী

বিশ্ব (পৃথিবী) যেন এক রাণী, অর্থাৎ সমস্ত পৃথিবী। (এখানে পৃথিবী গভীর ঘুমে মগ্ন বোঝানো হয়েছে)

ধ্বনিতেছে যেন

যেন আওয়াজ হচ্ছে বা শব্দ শোনা যাচ্ছে।

গোপন কী কানাকানি

গোপনে কোনো ফিসফিসানি, রহস্যময় বা অলৌকিক কিছু কথা।

 

সহসা বাবর ফুকারি উঠিল—’নাহি ভয় নাহি ভয়,

প্রার্থনা মোর কবুল করেছে আল্লাহ হে দয়াময়,

পুত্র আমার বাঁচিয়া উঠিবেমরিবে না নিশ্চয়।

 

শব্দ

অর্থ

সহসা

হঠাৎ করে, আকস্মিকভাবে।

ফুকারি উঠিল

চিৎকার করে উঠল, জোরে বলে উঠল।

নাহি ভয়

ভয় নেই।

প্রার্থনা মোর

আমার (মোর) প্রার্থনা বা আবেদন।

কবুল করেছে

গ্রহণ করেছে, মঞ্জুর করেছে, স্বীকার করেছে।

আল্লাহ হে দয়াময়

হে দয়ালু আল্লাহ, করুণাময় ঈশ্বর।

বাঁচিয়া উঠিবে

সুস্থ হয়ে উঠবে, জীবন ফিরে পাবে।

মরিবে না নিশ্চয়

নিশ্চিতভাবে বা অবশ্যই মারা যাবে না।

"ঘুরিতে লাগিল পুলকে বাবর পুত্রের চারিপাশ

নিরাশ হৃদয় সে যেন আশায় দৃপ্ত জয়োল্লাস,

তিমির রাতের তোরণে তোরণে ঊষার পূর্বাভাস।

 

শব্দ

অর্থ

ঘুরিতে লাগিল

ঘুরতে শুরু করল।

পুলকে

আনন্দে, খুশিতে, পুলকিত হয়ে।

পুত্রের চারিপাশ

পুত্রের চারপাশে, পুত্রের চারিদিকে।

নিরাশ হৃদয়

হতাশ মন বা আশা হারানো হৃদয়।

আশায় দৃপ্ত জয়োল্লাস

আশার কারণে গর্বিত এবং বিজয়ের আনন্দ।

তিমির

অন্ধকার।

রাতের তোরণে তোরণে

রাতের প্রবেশদ্বারগুলিতে বা বিভিন্ন স্তরে। (অন্ধকারের শেষ বোঝাতে ব্যবহৃত)

ঊষার পূর্বাভাস

ভোরের আগমন বার্তা, অন্ধকারের শেষে আলোর আগমন।

 

"সেইদিন হতে রোগ-লক্ষণ দেখা দিলে বাবরের,

হৃষ্টচিত্তে গ্রহন করিল শয্যা সে মরণের,

নতুন জীবন হুমায়ুন ধিরে বাঁচিয়া উঠিল ফের।"

 

শব্দ

অর্থ

সেইদিন হতে

সেই দিন থেকে শুরু করে।

রোগ-লক্ষণ

রোগের চিহ্ন বা উপসর্গ।

দেখা দিলে বাবরের

বাবরের শরীরে প্রকাশ পেল।

হৃষ্টচিত্তে

আনন্দিত মনে, খুশি মনে।

গ্রহন করিল

গ্রহণ করল, মেনে নিল।

শয্যা সে মরণের

সেই মৃত্যুর শয্যা, অর্থাৎ মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়া।

নতুন জীবন হুমায়ুন

হুমায়ুনের নতুন জীবন।

ধিরে

ধীরে ধীরে, আস্তে আস্তে।

বাঁচিয়া উঠিল ফের

আবার সুস্থ হয়ে উঠল, জীবন ফিরে পেল।

 

"মরিল বাবরনা, না ভুল কথা, মৃত্যু কে তারে কয়?

মরিয়া বাবর অমর হয়েছে, নাহি তার কোন ক্ষয়,

পিতৃস্নেহের কাছে হইয়াছে মরনের পরাজয়!"

শব্দ

অর্থ

মরিল বাবর

বাবর মারা গেলেন।

মৃত্যু কে তারে কয়?

মৃত্যুকে কে তাকে বলে? (অর্থাৎ, তার এই ত্যাগ সাধারণ মৃত্যু নয়)

মরিয়া বাবর

(নিজের প্রাণ) ত্যাগ করে বা মারা গিয়ে বাবর।

অমর হয়েছে

অমরত্ব লাভ করেছে, চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

নাহি তার কোন ক্ষয়

তার কোনো বিনাশ নেই, তার ত্যাগের মূল্য কখনো কমবে না।

পিতৃস্নেহের কাছে

বাবার ভালোবাসার কাছে।

হইয়াছে

হয়েছে।

মরণের পরাজয়

মৃত্যুর হার, মৃত্যু পরাভূত হয়েছে।

 

 'জীবন-বিনিময়' কবিতার বিশ্লেষণ ।

. গভীর উদ্বেগ

কবিতার লাইন

ব্যাখ্যা 

"বাদশা বাবর কাঁদিয়া ফিরিছে, নিদ নাহি চোখে তাঁর-"

বাদশার মনে কোনো শান্তি নেই। পুত্র হুমায়ুনের জীবন নিয়ে তিনি এতটাই উদ্বিগ্ন যে তাঁর চোখে জল, কিন্তু চোখে ঘুম নেই।

"পুত্র তাঁহার হুনায়ন বুঝি বাঁচে না এবার আর! চারিধারে তার ঘনায়ে আসিছে মরন-অন্ধকার।"

পুত্রের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মৃত্যুদূত যেন চারপাশ থেকে ঘিরে আসছে, যা বাবার চোখে ধরা পড়ছে।

. ব্যর্থ চেষ্টা

কবিতার লাইন

ব্যাখ্যা 

"রাজ্যের যত বিজ্ঞ হেকিম কবিরাজ দরবেশ / এসেছে সবাই, দিতেছে বসিয়া ব্যবস্থা সবিশেষ, / সেবাযত্নের বিধিবিধানের ত্রুটি নাহি এক লেশ।"

পুত্রকে বাঁচানোর জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চলছে। রাজ্যের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকরা এসেছেন এবং কোনো ত্রুটি রাখা হয়নি।

"তবু তাঁর সেই দুরন্ত রোগ হটিতেসে নাকো হায়, / যত দিন যায়, দুর্ভোগ তার ততই বারিয়া যায়— / জীবন-প্রদীপ নিভিয়া আসিছে অস্তরবির প্রায়।"

এত চেষ্টা সত্ত্বেও রোগ সারছে না। বরং দিন দিন কষ্ট বাড়ছে এবং মনে হচ্ছে জীবন-প্রদীপটি অস্তগামী সূর্যের মতোই নিভে যাবে।

 

. নীরব উত্তর

কবিতার লাইন

ব্যাখ্যা

"শুধাল বাবর ব্যগ্রকন্ঠে ভিষকব্রিন্দে ডাকি, / ‘বলো বলো আজি সত্যি করিয়া, দিও নাকো মোরে ফাঁকি, / এই রোগ হতে বাদশাজাদার মুক্তি মিলিবে নাকি?”"

পিতা হিসেবে বাবর শেষবারের মতো আশা খুঁজছেন। তিনি স্পষ্ট উত্তর জানতে চান, কোনো মিথ্যে সান্ত্বনা চান না।

"নতমস্তকে রহিল সবাই, কহিল না কোনো কথা, / মুখর হইয়া উঠিল তাঁদের সে নিষ্ঠুর নীরবতা / শেলসম আসি বাবরের বুকে বিঁধিল কিসের ব্যাথা!"

চিকিৎসকরা কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তাদের এই নীরবতাই ছিল সবচেয়ে কঠিন উত্তরহুমায়ুনের বাঁচার আশা নেই। এই নীরবতাই বাবরের মনে গভীর বেদনা সৃষ্টি করে।

. দরবেশের শর্ত

কবিতার লাইন

ব্যাখ্যা

"হেনকালে এক দরবেশ উঠি কহিলেন—‘সুলতান, / সবচেয়ে তব শ্রেষ্ট যে-ধন দিতে যদি পার দান, / খুশি হয়ে তবে বাঁচাবে আল্লা বাদশাজাদার প্রান।’"

কাহিনিতে মোড় এসেছে। চিকিৎসার বদলে এখন ঈশ্বরের কাছে ত্যাগের মাধ্যমে পুত্রের প্রাণভিক্ষার শর্ত দেওয়া হচ্ছে।

"শুনিয়া সে কথা কহিল বাবর শঙ্কা নাহিক মানি- / ‘তাই যদি হয়, প্রস্তুত আমি দিতে সেই কোরবানি, / সবচেয়ে মোর শ্রেষ্ঠ যে ধন জানি তাহা আমি জানি।’"

বাবর কোনো দ্বিধা করেননি। তিনি বিশ্বাস করেন, পুত্রের জীবনের চেয়ে দামি আর কিছু হতে পারে না, এবং তিনি সেই ত্যাগ করতে জানেন।

 

. চরম ত্যাগ

কবিতার লাইন

ব্যাখ্যা

"এতেক বলিয়া আসন পাতিয়া নিরিবিলি গৃহতল / গভীর ধেয়ানে বসিল বাবর শান্ত অচঞ্চল, / প্রার্থনারত হাতদুটি তাঁর, নয়নে অশ্রু জল।"

বাবর ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত হলেন। তিনি গভীর মনোযোগে (ধেয়ানে) বসলেন।

"কহিল কাঁদিয়া- ‘হে দয়াল খোদা, হে রহিম রহমান, / মোর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় আমারি আপন প্রাণ, / তাই নিয়ে প্রভু পুত্রের প্রান কর মোরে প্রতিদান।’"

চূড়ান্ত ত্যাগ: বাবর বুঝতে পারেন যে সাম্রাজ্য নয়, ক্ষমতা নয়তাঁর কাছে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ধন হলো তাঁর নিজের জীবন। তিনি শর্ত মেনে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে চাইলেন।

 

. অলৌকিক মোড় পরিণতি

কবিতার লাইন

ব্যাখ্যা

"স্তব্ধ-নীরব গৃহতল, মুখে নাহি তার বাণী, / গভীর রজনী, সুপ্তি-মগন নিখিল বিশ্বরাণী, / আকাশে বাতাসে ধ্বনিতেছে যেন গোপন কী কানাকানি।"

বাবরের প্রার্থনার গভীরতা প্রকৃতিতেও প্রভাব ফেলেছে। মনে হচ্ছে যেন ঈশ্বর বা প্রকৃতির সঙ্গে কোনো গোপন বোঝাপড়া চলছে।

"সহসা বাবর ফুকারি উঠিল—’নাহি ভয় নাহি ভয়, / প্রার্থনা মোর কবুল করেছে আল্লাহ হে দয়াময়, / পুত্র আমার বাঁচিয়া উঠিবেমরিবে না নিশ্চয়।’"

বাবর অলৌকিকভাবে অনুভব করলেন যে তাঁর কোরবানি আল্লাহ গ্রহণ করেছেন এবং তাঁর পুত্র বাঁচবে। এটি তাঁর ত্যাগের ফল।

"ঘুরিতে লাগিল পুলকে বাবর পুত্রের চারিপাশ / নিরাশ হৃদয় সে যেন আশায় দৃপ্ত জয়োল্লাস, / তিমির রাতের তোরণে তোরণে ঊষার পূর্বাভাস।"

বাবরের হৃদয়ে এখন জয়োল্লাস। তিনি নিশ্চিত, তাঁর পুত্র জীবন ফিরে পাবে।

"সেইদিন হতে রোগ-লক্ষণ দেখা দিলে বাবরের, / হৃষ্টচিত্তে গ্রহন করিল শয্যা সে মরণের, / নতুন জীবন হুমায়ুন ধিরে বাঁচিয়া উঠিল ফের।"

বাবরের জীবনের বিনিময়ে হুমায়ুনের জীবন রক্ষা পেল। পিতা নিজের মৃত্যুশয্যাকে সানন্দে বরণ করলেন।

"মরিল বাবরনা, না ভুল কথা, মৃত্যু কে তারে কয়? / মরিয়া বাবর অমর হয়েছে, নাহি তার কোন ক্ষয়, / পিতৃস্নেহের কাছে হইয়াছে মরনের পরাজয়!"

উপসংহার: বাবর শারীরিকভাবে মারা গেলেও, তাঁর আত্মত্যাগ তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে। এই মহান পিতৃস্নেহের কাছে মৃত্যুও পরাজিত হয়েছে।

 

 সমাস পরিচিতি।। বিস্তারিত ও শর্ট টেকনিক।। MCQ সহ ।।সরকারি চাকরি ও ভর্তি পরীক্ষার জন্য।।


সেট ও ফাংশন || অধ্যায় ২ সম্পূর্ণ সমাধান a to z || SSC || class 9-10

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন