লেকচার: বই পড়া (প্রবন্ধ) – প্রমথ চৌধুরী।
প্রবন্ধের বিস্তারিত আলোচনা।
আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটা 'বিদ্যার কারখানা'র মতো, যেখানে শিক্ষার্থীদের ওপর পাঠ্যবই চাপিয়ে দেওয়া হয়। লেখক এই বাধ্যবাধকতার ঘোর বিরোধী। তিনি মনে করেন, মনের বিকাশের জন্য যেমন সাহিত্যের রস আস্বাদন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন একটি মুক্ত পরিবেশ—যা কেবল লাইব্রেরিতেই সম্ভব। প্রবন্ধের মূল কথা হলো, রাষ্ট্র বা সমাজ জোর করে কাউকে শিক্ষিত করতে পারে না, যদি না ব্যক্তির মধ্যে পড়ার আগ্রহ থাকে। তাই শিক্ষার প্রধান কাজ হওয়া উচিত মানুষের মনে বই পড়ার নেশা ও কৌতূহল জাগিয়ে তোলা।
পয়েন্ট আকারে মূল বিষয়ের ব্যাখ্যা ও বাস্তব উদাহরণ।
নিচে প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো পয়েন্ট আকারে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. বই পড়ার শখ ও সামাজিক বাধা।
- ব্যাখ্যা: লেখক বই পড়াকে মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ শখ মনে করেন। তবে তিনি আক্ষেপ করেছেন যে, আমাদের মতো অভাবের দেশে কেউ কাউকে বই পড়ার পরামর্শ দিলে তা অনেকে রসিকতা বা বিলাসিতা মনে করেন। কারণ মানুষ জীবন ধারণের তাগিদে জ্ঞান চর্চার চেয়ে অর্থ উপার্জনকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
- বাস্তব উদাহরণ: ছোটবেলায় অনেক সময় আমাদের জোর করে অংক বা বিজ্ঞানের সূত্র মুখস্থ করানো হয়। আমরা ভয়ে তা মুখস্থ করি, কিন্তু কেন শিখছি তা বুঝতে পারি না। এই 'আনন্দহীন শিক্ষা' কোনো কাজে আসে না। কিন্তু যখন আমরা নিজে থেকে একটি রোমাঞ্চকর গল্পের বই পড়ি, সেই কাহিনী আমরা জীবনেও ভুলি না।
২. সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত।
- ব্যাখ্যা: প্রমথ চৌধুরীর মতে, প্রকৃত শিক্ষা কেউ বাজার থেকে কিনে আনতে পারে না। শিক্ষক শুধু পথপ্রদর্শক হতে পারেন। তিনি শুধু প্রদীপ জ্বালাতে পারেন, কিন্তু সেই প্রদীপের আলোয় পড়ার দায়িত্ব ছাত্রের নিজের। যার নিজের মধ্যে জানার আগ্রহ নেই, তাকে পৃথিবীর কোনো শিক্ষক বা বই শিক্ষিত করতে পারবে না। এছাড়াও আরো বলা যায় স্টিভ জবস বা বিল গেটসের মতো সফল মানুষেরা প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা পূর্ণ না করেও পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ব্যক্তি হয়েছেন। কারণ তাঁরা ছিলেন 'স্বশিক্ষিত'। তাঁরা বই পড়ে এবং কাজ করে নিজে নিজে শিখেছেন।
- বাস্তব উদাহরণ: কোনো কোচিং সেন্টার বা গৃহশিক্ষক কাউকে গোল্ডেন জিপিএ পাইয়ে দিতে পারেন, কিন্তু তাকে 'জ্ঞানী' বানাতে পারেন না। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াও স্বশিক্ষিত হয়েই বিশ্ব জয় করেছেন।
৩. লাইব্রেরি: মনের হাসপাতাল।
- ব্যাখ্যা: লেখক লাইব্রেরিকে স্কুল-কলেজের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ লাইব্রেরিতে মানুষের ওপর কোনো পাঠ্যক্রম বা সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই। মানুষ সেখানে তার নিজস্ব রুচি অনুযায়ী বই বেছে নিতে পারে, যা তার মানসিক ব্যাধি বা জড়তা দূর করে।
- বাস্তব উদাহরণ: হাসপাতালে যেমন দেহের চিকিৎসার জন্য মানুষ স্বাধীনভাবে যায়, তেমনি মনের সংকীর্ণতা বা অজ্ঞানতা দূর করতে মানুষ যখন লাইব্রেরিতে যায়, তখনই তার প্রকৃত বিকাশ ঘটে।
৪. স্কুল-কলেজের 'উদরপূর্তি' বনাম 'মনন'।
- ব্যাখ্যা: প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে লেখক 'জোর করে গেলানো'র সাথে তুলনা করেছেন। ছাত্ররা নোট মুখস্থ করে পাস করে ঠিকই, কিন্তু তাদের সৃজনশীলতা নষ্ট হয়ে যায়। তারা অনেকটা তোতাপাখির মতো হয়ে ওঠে।
- বাস্তব উদাহরণ: পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য আমরা অনেক সময় কঠিন থিওরি না বুঝেই মুখস্থ করি। এই বিদ্যা পরীক্ষার খাতা পর্যন্ত স্থায়ী হয়, কিন্তু জীবনের ক্ষেত্রে কোনো কাজে আসে না।
৫. সাহিত্যের আবশ্যকতা ও জাতির মুক্তি।
- ব্যাখ্যা: অনেকে মনে করেন সাহিত্য পড়ে পেট ভরে না। কিন্তু লেখক বলেছেন, জাতির প্রাণের বিকাশের জন্য সাহিত্যের রস গ্রহণ করা অপরিহার্য। দর্শন বা বিজ্ঞান বুদ্ধির চর্চা করে, কিন্তু সাহিত্য চর্চা হৃদয়ের প্রসার ঘটায়।
- বাস্তব উদাহরণ: একটি জাতির কেবল অর্থনৈতিক উন্নতি হলে তাকে উন্নত বলা যায় না। যদি সেই জাতির মানুষের মধ্যে সংস্কৃতি ও সাহিত্যবোধ না থাকে, তবে তারা মানসিকভাবে দেউলিয়া থেকে যায়।
৬. ব্যাধি সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়।
- ব্যাখ্যা: এটি একটি চমৎকার মেটাফর। লেখক বুঝিয়েছেন, কুশিক্ষা বা খারাপ অভ্যাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু সুশিক্ষা বা প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করা কষ্টসাধ্য। জোর করে কারো ওপর শিক্ষা চাপিয়ে দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
- বাস্তব উদাহরণ: যেমন সুস্থ মানুষের পাশে বসলে সুস্থ হওয়া যায় না, কিন্তু অসুস্থ মানুষের পাশে বসলে রোগ হতে পারে। তেমনি কেবল ডিগ্রিধারী মানুষের সাথে থাকলেই কেউ জ্ঞানী হয় না, জ্ঞান অর্জন করতে হয় গভীর সাধনায়।
- ব্যাখ্যা: লেখক মনে করেন, স্কুল-কলেজ হলো অনেকটা শৃঙ্খলার জায়গা, যেখানে সিলেবাসের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু লাইব্রেরি হলো একটি বিশাল সমুদ্র, যেখানে মানুষ তার পছন্দের মুক্তা খুঁজে নিতে পারে। লাইব্রেরিতে কোনো 'নোট' বা 'মুখস্থ' করার চাপ নেই, তাই সেখানে শেখাটা হয় আনন্দের।
- বাস্তব উদাহরণ: ক্লাসরুমে আমাদের নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট অধ্যায় পড়তে হয়। কিন্তু লাইব্রেরিতে গেলে তুমি একই সাথে ইতিহাস, বিজ্ঞান এবং কবিতা পড়তে পারো। এই বৈচিত্র্যই তোমার চিন্তাশক্তিকে বাড়িয়ে দেয়।
৮. ফলপিপাসু সমাজ ও শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ।
- ব্যাখ্যা: আমাদের সমাজ শিক্ষার 'নগদ মূল্য' খোঁজে। সন্তান বড় হয়ে কত টাকা বেতন পাবে—এটিই শিক্ষার মূল মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেখক এই মানসিকতাকে 'ফলপিপাসু' বলেছেন। মানুষ যখন শুধু ফলের (চাকরি/টাকা) আশায় কাজ করে, তখন সে কাজের আনন্দ পায় না।
- বাস্তব উদাহরণ: অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী তার পছন্দের বিষয় (যেমন: সাহিত্য বা চারুকলা) পড়তে পারে না শুধু পরিবারের চাপে, কারণ সেগুলোতে নাকি 'টাকা নেই'। এই বাণিজ্যিক মানসিকতা আমাদের সৃজনশীলতা মেরে ফেলছে।
৯. সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা (অন্তরের বিকাশ)।
- ব্যাখ্যা: প্রমথ চৌধুরী মনে করেন, বিজ্ঞান বা দর্শন শুধু যুক্তির কথা বলে, কিন্তু সাহিত্য মানুষের হৃদয়ের সাথে কথা বলে। সাহিত্য মানুষকে সহমর্মী এবং মানবিক করে তোলে। যে জাতির মধ্যে সাহিত্য চর্চা নেই, সেই জাতি মানসিকভাবে মৃত।
- বাস্তব উদাহরণ: একজন রোবট অনেক কাজ করতে পারে, কারণ সে প্রোগ্রাম করা। কিন্তু মানুষের আবেগ বা অন্যের দুঃখ বোঝার ক্ষমতা থাকে না। সাহিত্য চর্চা আমাদের সেই আবেগ এবং মানবিকতা দেয়, যা আমাদের রোবট থেকে আলাদা করে।
১০. ব্যাধি সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয় – এর গূঢ় অর্থ।
- ব্যাখ্যা: এটি লেখকের অন্যতম সেরা পর্যবেক্ষণ। এর অর্থ হলো, আমরা খারাপ কিছু খুব দ্রুত অন্যের থেকে শিখে ফেলি, কিন্তু ভালো গুণগুলো অর্জন করতে কষ্ট হয় এবং এটি একা একাই করতে হয়। কুশিক্ষা বা ভুল ধারণা সমাজে মহামারীর মতো ছড়ায়, কিন্তু সুশিক্ষা বা প্রকৃত জ্ঞান একাগ্র সাধনায় অর্জন করতে হয়।
- বাস্তব উদাহরণ: কেউ যদি ধূমপান বা বাজে আড্ডা দেয়, তবে তার বন্ধুরা খুব দ্রুত তা শিখে ফেলে। কিন্তু কেউ যদি প্রতিদিন ২ ঘণ্টা বই পড়ে, তবে তার বন্ধুরা সহজে সেই অভ্যাসটি নিতে পারে না। কারণ জ্ঞান অর্জন একটি ব্যক্তিগত পরিশ্রমের বিষয়।
সেরা ১৫টি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর (Short Q&A)
১. প্রমথ চৌধুরীর ছদ্মনাম কী?
উত্তর: বীরবল।
২. 'বই পড়া' প্রবন্ধটি কোন গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে?
উত্তর: প্রবন্ধ সংগ্রহ।
৩. লেখকের মতে সর্বশ্রেষ্ঠ শখ কোনটি?
উত্তর: বই পড়া।
৪. সুশিক্ষিত লোক মাত্রই কী?
উত্তর: স্বশিক্ষিত।
৫. লাইব্রেরিকে লেখক কিসের সাথে তুলনা করেছেন?
উত্তর: লাইব্রেরিকে লেখক 'মনের হাসপাতাল' হিসেবে তুলনা করেছেন।
৬. 'ভাঁড়ে ভবানী' প্রবাদটির অর্থ কী?
উত্তর: রিক্ত বা শূন্য অবস্থা।
৭. কারা দর্শনের চর্চা গুহায় এবং নীতির চর্চা ঘরে করেন?
উত্তর: জাতে যারা বড় বা উন্নত জাতি।
৮. শিক্ষকের সার্থকতা কোথায়?
উত্তর: ছাত্রকে শিক্ষা অর্জনে সক্ষম করায়।
৯. লাইব্রেরির স্থান হাসপাতালের উপরে কেন?
উত্তর: কারণ লাইব্রেরি মানুষের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করে।
১০. ডেমোক্রেসির শিষ্যরা কী বোঝে না? -
উত্তর: ডেমোক্রেসির শিষ্যরা গুণের চেয়ে সংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
১১. আমাদের দেশে কিসের অভাব নেই? -
উত্তর: আমাদের দেশে শিক্ষার অভাব নেই, কিন্তু সুশিক্ষার অভাব রয়েছে।
১২. মানুষের মনকে সজাগ ও সবল রাখার উপায় কী? -
উত্তর: সাহিত্য চর্চা করা।
১৩. প্রমথ চৌধুরী কত সালে জন্মগ্রহণ করেন? -
উত্তর: ৭ই আগস্ট, ১৮৬৮ সালে।
১৪. শিক্ষা কেউ কাউকে কী করতে পারে না? -
উত্তর: দান করতে পারে না।
১৫. আমাদের শিক্ষিত সমাজ কিসের চর্চা করতে চায় না? -
উত্তর: দর্শন ও সাহিত্যের চর্চা।
বই পড়া প্রবন্ধের ১০টি সেরা অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
১. "সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত"— ব্যাখ্যা করো।
প্রকৃত শিক্ষা কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জন করা যায় না, এটি সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি প্রক্রিয়া।
শিক্ষক কেবল ছাত্রকে শিক্ষার পথ দেখিয়ে দেন কিন্তু জ্ঞান আহরণ করতে হয় নিজের আগ্রহে। মনের প্রসারের মাধ্যমে যখন কেউ নিজ চেষ্টায় শিক্ষিত হয়, তখনই তাকে প্রকৃত সুশিক্ষিত বলা যায়। স্বকীয় সাধনায় অর্জিত এই শিক্ষাই জীবনের আসল সার্থকতা।
২. লেখক লাইব্রেরিকে স্কুল-কলেজের উপরে স্থান দিয়েছেন কেন?
স্কুল-কলেজে শিক্ষার নামে জবরদস্তি চললেও লাইব্রেরিতে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়।
প্রতিষ্ঠানগুলোতে সিলেবাসের চাপে শিক্ষার্থীর স্বাধীন চিন্তা করার বা পছন্দমতো জ্ঞান অর্জনের সুযোগ থাকে না। কিন্তু লাইব্রেরিতে মানুষ নিজের রুচি অনুযায়ী স্বাধীনভাবে বই পড়ে নিজের মনকে বিকশিত করতে পারে। এই স্বাধীনতার কারণেই লেখক লাইব্রেরিকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন।
৩. "ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়"— কথাটির তাৎপর্য কী?
সমাজে নেতিবাচক বিষয় বা কুসংস্কার খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও সুস্বাস্থ্য বা মহৎ গুণ সহজে অন্যকে প্রভাবিত করে না।
লেখক এখানে ডেমোক্রেসির কুফল সম্পর্কে পাঠকদের সতর্ক করতে এই বিশেষ বাক্যটি ব্যবহার করেছেন। আমরা পাশ্চাত্যের ডেমোক্রেসি থেকে তাদের মহৎ গুণগুলো না শিখে কেবল তাদের ত্রুটিগুলোই দ্রুত রপ্ত করেছি। ক্ষতিকর বিষয় দ্রুত গ্রহণ করার এই প্রবণতাই এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
৪. "সাহিত্যের সার্থকতা বোঝার ক্ষমতা এ জাতির নেই"— কেন বলা হয়েছে?
আমাদের জাতি বর্তমানে চরম অর্থলিপ্সু এবং আমরা কেবল সেই বিদ্যাকেই দামী মনে করি যা সরাসরি টাকা দেয়।
সাহিত্য সরাসরি অর্থ উপার্জনে সাহায্য করে না বলে আমাদের সমাজ একে অপ্রয়োজনীয় বা অনর্থক মনে করে। যে জাতি কেবল বস্তুগত লাভ খোঁজে, তারা সাহিত্যের ভেতরের আনন্দ ও মানসিক উন্নতির দিকটি উপলব্ধি করতে পারে না। এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই লেখক আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন।
৫. বই পড়াকে লেখক 'সর্বশ্রেষ্ঠ শখ' বললেও তা করতে উপদেশ দেন না কেন?
লেখক মনে করেন শখ একটি ব্যক্তিগত বিষয় এবং এটি কাউকে উপদেশ দিয়ে জোর করে করানো সম্ভব নয়।
জোর করে কোনো শখ চাপিয়ে দিলে তার আসল আনন্দ হারিয়ে যায় এবং মানুষ তাকে বোঝা মনে করে। এছাড়া আমাদের অভাবগ্রস্ত সমাজে শখ করাকে অনেকে বিলাসিতা মনে করে ভুল বুঝতে পারে। তাই লেখক উপদেশ দিতে গিয়েও দ্বিধাবোধ করেছেন।
৬. "শিক্ষকের সার্থকতা ছাত্রকে শিক্ষিত করায় নয়"— বুঝিয়ে লেখো।
শিক্ষকের মূল দায়িত্ব ছাত্রকে তথ্য মুখস্থ করানো নয়, বরং তার ভেতরের সুপ্ত মেধা ও কৌতূহলকে জাগিয়ে তোলা।
তিনি ছাত্রের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেন যাতে ছাত্র নিজেই শিখতে পারে। ছাত্র যখন নিজের চেষ্টায় জ্ঞানের আলো খুঁজে পায়, তখনই শিক্ষকের শ্রম সার্থক হয়। মূলত ছাত্রকে শিক্ষা অর্জনে সক্ষম করে তোলাই শিক্ষকের প্রকৃত কাজ।
৭. "folded arms" বা 'ভাঁড়ে ভবানী' বলতে লেখক কী বুঝিয়েছেন?
'ভাঁড়ে ভবানী' প্রবাদটি লেখক আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতা ও চরম রিক্ততা বোঝাতে ব্যবহার করেছেন।
বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিতে পাস করা যুবকদের হাতে সার্টিফিকেট থাকলেও তারা প্রকৃত জ্ঞান ও কর্মদক্ষতায় শূন্য থাকে। এটি এমন এক অবস্থা যেখানে ডিগ্রির চাকচিক্য থাকলেও মনের ভেতরের ভাণ্ডার রিক্ত ও রসহীন। এই শূন্যতা জাতির মেরুদণ্ড দুর্বল করে দিচ্ছে।
৮. জাতে ওঠার জন্য আমাদের কেন সাহিত্য চর্চা করা উচিত?
একটি জাতির উন্নতির মাপকাঠি কেবল তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়, বরং তার উন্নত ও উদার মানসিকতা।
মানসিক আভিজাত্য ও মহৎ চিন্তা জন্ম দেওয়ার একমাত্র মাধ্যম হলো নিয়মিত সাহিত্য চর্চা করা। জাতে ওঠা বা উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করতে হলে মনের প্রসার প্রয়োজন। সেই প্রসারিত মনের অধিকারী হতে সাহিত্যের কোনো বিকল্প নেই।
৯. "গণতন্ত্র কেবল সাম্যের গান গায়"— উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
গণতন্ত্র মূলত সংখ্যাতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে যোগ্য-অযোগ্য নির্বিশেষে সবাইকে সমান সারিতে দাঁড় করাতে চায়।
এটি অনেক সময় ব্যক্তির উচ্চতর মেধা, স্বকীয় প্রতিভা বা গুণের চেয়ে সংখ্যার আধিক্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। সাহিত্যের উৎকর্ষ যেখানে গুণের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে গণতন্ত্রের এই যান্ত্রিক সাম্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। লেখক মূলত ডেমোক্রেসির এই যান্ত্রিক নীতির সমালোচনা করেছেন।
১০. পাস করা ও শিক্ষিত হওয়া এক জিনিস নয় কেন?
পাস করা মানে কেবল পাঠ্যবই মুখস্থ করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, কিন্তু শিক্ষিত হওয়া মানে আত্মিক বিকাশ।
ডিগ্রি অর্জন করলে সার্টিফিকেট পাওয়া যায় কিন্তু মানসিক অন্ধকার বা সংকীর্ণতা দূর নাও হতে পারে। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের বিবেক জাগ্রত করে এবং চরিত্র গঠন করে যা কেবল পরীক্ষার খাতায় পাস করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাই এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান পাহাড়সম।

