...

‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার সৃজনশীল, জ্ঞানমূলক ও অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর ।

বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার প্রশ্ন -উত্তর।


পরীক্ষায় শতভাগ প্রস্তুতির সুবিধার্থে এই পোস্টে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার ৫টি গুরুত্বপূর্ণ সৃজনশীল, ৩০টি জ্ঞানমূলক এবং ১৫টি অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর সহজ ভাষায় শেয়ার করা হলো।একাডেমিক ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য এই অধ্যায়ের পাশাপাশি ব্যাকরণেও সমান দক্ষতা থাকা জরুরি। বাংলা ২য় পত্রের ভালো ভিত গড়তে আমাদের [ধ্বনি ও বর্ণ] এবং [সন্ধি] অধ্যায়ের গাইডলাইনগুলো দেখে নিতে পারো। ঠিক একইভাবে, ইংরেজি গ্রামারে বাক্য গঠনের মূল ভিত্তি [Parts of Speech], ক্রিয়ার সঠিক ব্যবহারের জন্য [Verb] এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত নম্বরের জন্য [Voice Change] এর সহজ নিয়মগুলো অনুশীলন করা অত্যন্ত প্রয়োজন।চলো, কথা না বাড়িয়ে ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর সংকলনটি দেখে নেওয়া যাক

সৃজনশীল প্রশ্ন - ১


বঙ্গভুমির প্রতি কবিতার সৃজনশীল

কবি সুকান্ত বহু বছর প্রবাসে কাটিয়ে শেষ বয়সে নিজের জন্মভূমিতে ফিরে আসেন। তিনি মনে করেন, যৌবনে খ্যাতির মোহে মাতৃভূমিকে ছেড়ে দূরে থাকাটা তাঁর জীবনের এক মস্ত বড় ভুল ছিল। স্বদেশে ফিরে তিনি এক জনসভায় বলেন, "হে দেশমাতা, আমি হয়তো তোমার জন্য তেমন কিছুই করতে পারিনি, তবু তোমার এই মাটিতেই যেন আমি চিরতরে ঘুমে মগ্ন হতে পারি। তুমি তোমার এই সন্তানকে ক্ষমা করে দিও এবং চিরকাল মনে রেখো।"

ক. ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতায় কবি নিজেকে কার দাস বলেছেন?
খ. "মক্ষিকাও গলে না গো, পড়িলে অমৃত-হ্রদে"— উক্তিটি বুঝিয়ে লেখো। 
গ. উদ্দীপকের কবি সুকান্তের অনুশোচনা ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কোন দিকটিকে নির্দেশ করে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “সুকান্তের শেষ ইচ্ছাটি যেন ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কবির আকুল প্রার্থনারই প্রতিধ্বনি”— মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো। 


(ক) জ্ঞানমূলক উত্তর।

‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতায় কবি নিজেকে বঙ্গমাতার পদে নিবেদিত ‘দাস’ বলেছেন।

(খ) অনুধাবনমূলক উত্তর: (২ প্যারা, ৪ লাইন)।


উক্তিটির প্রেক্ষাপট: প্রশ্নোক্ত উক্তিটি দ্বারা কবি বুঝিয়েছেন যে, গুণী মানুষ যদি কোনো মহান কীর্তি রেখে যান, তবে তিনি সমাজে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন।

অমৃতের হ্রদে মাছি পড়লে যেমন তা মরে না বা পচে না, তেমনি মাতৃভূমির হৃদয়ে স্থান পাওয়া মানুষ কখনো বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায় না। দেশের জন্য ভালো কাজ করলে মানুষ অমরত্ব লাভ করে।

(গ) প্রয়োগমূলক উত্তর: (৩ প্যারা, ৭ লাইন)।


উদ্দীপকের কবি সুকান্তের অনুশোচনা ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কবির প্রবাস জীবনের ভুল এবং মাতৃভূমির কাছে ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতাকে নির্দেশ করে।

কবিতায় দেখা যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত খ্যাতির মোহে স্বদশ ছেড়ে বিদেশে গিয়েছিলেন, যা তিনি পরবর্তীতে নিজের জীবনের এক পরম 'কোকনদ' বা মনের ভুল হিসেবে স্বীকার করেছেন।

উদ্দীপকের কবি সুকান্তও বহু বছর প্রবাসে কাটানোর পর যৌবনের এই সিদ্ধান্তকে তাঁর জীবনের এক মস্ত বড় ভুল ও মোহের বহিঃপ্রকাশ বলে অনুশোচনা করেছেন। নিজের ভুল বুঝতে পেরে দেশমাতার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করার এই যে ব্যাকুলতা, তা ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কবির চিরন্তন আত্মোপলব্ধি ও অনুশোচনার দিকটিকেই ফুটিয়ে তোলে।

(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক উত্তর: (৪ প্যারা, ১০ লাইন)।


উদ্দীপকের সুকান্তের শেষ ইচ্ছাটি ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কবির অমরতা লাভের আকুল আকাঙ্ক্ষাকে হুবহু ধারণ করায় মন্তব্যটি সম্পূর্ণ যথার্থ।

‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার মূল চেতনা হলো মাতৃভূমির কোলে চিরকাল বেঁচে থাকার এবং দেশের মানুষের স্মৃতিতে অমর হয়ে থাকার আকুল প্রার্থনা।

কবিতায় কবি বঙ্গমাতার কাছে মিনতি করেছেন যেন দেশমাতা তাঁকে মনে রাখেন এবং তিনি যেন স্বদেশের মাটিতেই পদ্মফুলের মতো চিরকাল ফুটে থাকতে পারেন। উদ্দীপকের কবি সুকান্তও দেশমাতার মাটিতে চিরতরে ঘুমে মগ্ন হওয়ার এবং মায়ের স্মৃতিতে বেঁচে থাকার শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

সুতরাং, উভয় কবির হৃদয়েই মাতৃভূমির প্রতি পরম ভক্তি এবং মৃত্যুর পরও স্বদেশের স্মৃতিতে বেঁচে থাকার এক তীব্র ব্যাকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। তাই বলা যায়, সুকান্তের শেষ ইচ্ছাটি ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কবির আকুল প্রার্থনারই এক চমৎকার প্রতিধ্বনি।

সৃজনশীল প্রশ্ন - ২


উদ্দীপক: শিল্পী জামিল সাহেব প্যারিসে দীর্ঘ দিন চিত্রাঙ্কন করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন। কিন্তু এত সাফল্যের মাঝেও তাঁর মন পড়ে থাকত বাংলাদেশের পল্লি গাঁয়ের মেঠো পথে। তিনি তাঁর শেষ চিঠিতে লিখেছিলেন, "আমি হয়তো দেশের মাটিতে বসে দেশের মানুষের জন্য ছবি আঁকতে পারিনি, আমার কোনো গুণ নেই। কিন্তু হে আমার মাতৃভূমি, তোমার এই অধম সন্তানকে তুমি ভুলে যেও না। তোমার স্নেহের আঁচলে আমায় একটুখানি মনে রাখার জায়গা দিও।"

ক. ‘কোকনদ’ শব্দটির অর্থ কী?
খ. "জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে"— কবি কেন এ কথা বলেছেন? 
গ. উদ্দীপকের জামিল সাহেবের বিনয় ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কোন ভাবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ? ব্যাখ্যা করো। 
ঘ. “জামিল সাহেবের মানসিকতা ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার মূল ভাবার্থকেই ধারণ করে”— উক্তিটি মূল্যায়ন করো। 

(ক) জ্ঞানমূলক উত্তর:

‘কোকনদ’ শব্দটির অর্থ হলো— লাল পদ্ম।

(খ) অনুধাবনমূলক উত্তর: (২ প্যারা, ৪ লাইন)


উক্তিটির প্রেক্ষাপট: প্রশ্নোক্ত চরণে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত জাগতিক জীবনের নশ্বরতা ও চিরন্তন সত্যকে প্রকাশ করেছেন।

পৃথিবীতে যেকোনো জীব জন্মগ্রহণ করলে তাকে একদিন অবশ্যই মৃত্যুবরণ করতে হবে, কারণ কেউ এখানে চিরস্থায়ী নয়। এই ধ্রুব সত্যকে মেনে নিয়েই কবি মাতৃভূমির সেবায় এমন কিছু করতে চেয়েছেন যা তাঁকে মৃত্যুর পরও অমর রাখবে।

(গ) প্রয়োগমূলক উত্তর: (৩ প্যারা, ৭ লাইন)


উদ্দীপকের জামিল সাহেবের বিনয় ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কবির নিজের দৈন্যতা স্বীকার ও বিনম্র আত্মসমর্পণের ভাবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

কবিতায় কবি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বঙ্গমাতাকে বলেছেন যে, তাঁর এমন কোনো শুভগুণ বা বিশেষ সাধনা নেই যার কারণে তিনি দেশমাতার কাছে অমরতার বর বা আশীর্বাদ চাইতে পারেন।

উদ্দীপকের শিল্পী জামিল সাহেবও আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ার পরও স্বদেশের কাছে নিজেকে অতি সাধারণ মনে করেছেন এবং নিজের কোনো গুণ নেই বলে অকপটে স্বীকার করেছেন। মাতৃভূমির বিশালতার সামনে নিজের অহংকার বিসর্জন দিয়ে এই যে নিজেকে অধম ও গুণহীন ভাবার মানসিকতা, তা মধুসূদন দত্তের বিনম্র কাব্যোচ্ছ্বাসের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।

(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক উত্তর: (৪ প্যারা, ১০ লাইন)


জামিল সাহেবের দেশপ্রেম ও অমরতা পাওয়ার আকুলতা ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার মূল ভাবার্থের সাথে একসূত্রে গাঁথা, তাই মন্তব্যটি অনস্বীকার্য।

‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার মূল ভাবার্থ হলো— দূর প্রবাসে থাকলেও মাতৃভূমির প্রতি নাড়ির টান এবং স্বদেশের স্মৃতিপটে বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি।

কবিতায় কবি পরবাসে থাকলেও মন থেকে দেশমাতাকে ভুলতে পারেননি এবং মায়ের কাছে মিনতি করেছেন যেন মা তাঁর দোষ ভুলে শুধু গুণটুকুই মনে রাখেন। উদ্দীপকের জামিল সাহেবও প্যারিসে থেকেও দেশের মেঠো পথকে ভোলেননি এবং শেষ সময়ে মাতৃভূমির স্নেহের আঁচলে একটুখানি মনে রাখার জায়গা চেয়েছেন।

সুতরাং, স্থান বা দূরত্বের ব্যবধান যে গভীর দেশপ্রেমকে বিন্দুমাত্র কমাতে পারে না, তা দুই জায়গাতেই সমানভাবে সত্য হয়ে উঠেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে জামিল সাহেবের মানসিকতা ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার মূল ভাবার্থেরই এক চমৎকার প্রতিচ্ছবি।

সৃজনশীল প্রশ্ন - ৩


উদ্দীপক: জননেতা আলতাফ আলী সারা জীবন দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করেছেন। সাধারণ মানুষ তাঁকে দেবতার মতো শ্রদ্ধা করত। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি তাঁর অনুসারীদের বলেন, "আমি ক্ষমতার মোহ বা পদের লোভে রাজনীতি করিনি। মানুষের ভালোবাসা পাওয়াই আমার জীবনের একমাত্র সার্থকতা। আমি মারা গেলেও যেন এই দেশের মানুষের হৃদয়ে মন-পদ্মে চিরকাল বেঁচে থাকতে পারি, এটাই আমার শেষ চাওয়া।"

ক. ‘মন-কোকনদ’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
খ. "যাচিহে অমরতা বরে"— কবি কার কাছে এবং কেন এই বর চাচ্ছেন? 
গ. উদ্দীপকের আলতাফ আলীর শেষ চাওয়া ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কোন চরণের ভাবকে মনে করিয়ে দেয়? ব্যাখ্যা করো। 
ঘ. “আলতাফ আলীর আজীবন দেশসেবা এবং কবির সাহিত্য সাধনা—উভয়ের লক্ষ্যই ছিল ‘মন-মানসে’ বেঁচে থাকা”— বিশ্লেষণ করো। 


(ক) জ্ঞানমূলক উত্তর:

‘মন-কোকনদ’ বলতে কবি মনের রূপ লাল পদ্ম বা মানসপদ্ম-কে বুঝিয়েছেন।

(খ) অনুধাবনমূলক উত্তর: (২ প্যারা, ৪ লাইন)


উক্তিটির প্রেক্ষাপট: প্রশ্নোক্ত চরণে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর জন্মভূমি বা বঙ্গমাতার কাছে অমরত্বের বর বা আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছেন।

পৃথিবীর সব মানুষকেই মরতে হবে জেনেও কবি এমন কীর্তি রেখে যেতে চান যাতে দেশমাতা তাঁকে ভুলে না যান। দেশের মানুষের স্মৃতির মাঝে চিরকাল বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাতেই তিনি এই অমরতা চাচ্ছেন।

(গ) প্রয়োগমূলক উত্তর: (৩ প্যারা, ৭ লাইন)


উদ্দীপকের আলতাফ আলীর শেষ চাওয়া ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার "ফুটি যেন স্মৃতি-জলে, মানসে, যথা ফলি মধুময় তামরস" চরণের ভাবকে মনে করিয়ে দেয়।

কবিতায় কবি আকুল প্রকাশ করেছেন যে, তিনি যেন দেশমাতার মন-কোকনদে বা স্মৃতিরূপ জলে চিরকাল শরৎকালের পদ্মফুলের মতো সতেজ ও প্রস্ফুটিত হয়ে বেঁচে থাকতে পারেন।

উদ্দীপকের জননেতা আলতাফ আলীও মৃত্যুর পর দেশের মানুষের হৃদয়ে ‘মন-পদ্মে’ চিরকাল বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। মানুষের মনের মণিকোঠায় নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার এই যে আকাঙ্ক্ষা, তা উদ্দীপকের নেতার ভাবনায় এবং কবিতার চরণে সমানভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে।

(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক উত্তর: (৪ প্যারা, ১০ লাইন)


উভয়ের কর্মক্ষেত্র ভিন্ন হলেও মানুষের হৃদয়ে বা ‘মন-মানসে’ স্থান পাওয়ার পরম লক্ষ্যটি হুবহু এক, তাই মন্তব্যটি সম্পূর্ণ যথার্থ।

‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতায় কবি তাঁর ভুল বুঝতে পেরে কাব্যসাধনা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে বঙ্গমাতার হৃদয়ে এবং বাঙালির স্মৃতিতে অমরতা লাভ করতে চেয়েছেন।

কবি জানেন যে একমাত্র দেশমাতার কৃপা ও মানুষের ভালোবাসাই মানুষকে নশ্বর পৃথিবীতে চিরস্মরণীয় করে রাখতে পারে। উদ্দীপকের আলতাফ আলীও ক্ষমতার লোভ না করে আজীবন নিঃস্বার্থ দেশসেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন।

সুতরাং, কবির সাহিত্য কীর্তি এবং নেতার জনকল্যাণমূলক কাজ—উভয়েরই শেষ পরিণতি হলো মানুষের হৃদয়ের মন-মানসে স্থায়ী আসন লাভ করা। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, আলতাফ আলীর আজীবন দেশসেবা এবং কবির সাহিত্য সাধনা—উভয়ের মূল লক্ষ্যই ছিল মানুষের মাঝে অমর হয়ে থাকা।


সৃজনশীল প্রশ্ন - ৪


বিখ্যাত বিজ্ঞানী ড. আশরাফ দীর্ঘ ৩০ বছর আমেরিকায় গবেষণা করে বহু পেটেন্ট ও আন্তর্জাতিক সম্মান লাভ করেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি বাংলাদেশে তাঁর পৈতৃক ভিটায় ফিরে আসেন। তিনি তাঁর ডায়েরিতে লেখেন— "বিজ্ঞানকে ভালোবেসে হয়তো বিশ্ববাসীকে অনেক কিছু দিয়েছি, কিন্তু যে মাটির কোলে আমার জন্ম, সেই বাংলাদেশের জন্য কিছুই করতে পারিনি। হে জন্মভূমি, আমার এই ব্যর্থতা তুমি ক্ষমা করো। তোমার এই শ্যামল মাটির বুকেই যেন আমার শেষ নিঃশ্বাসটুকু মেশে এবং তোমার সন্তানেরা যেন আমায় অন্তত একটু মনে রাখে।"

ক. ‘ক্ষিকাও গলে না গো, পড়িলে অমৃত-হ্রদে’— চরণে ‘মক্ষিকা’ শব্দের অর্থ কী?
খ. "মধুহীন করো না গো, তব মনঃ-কোকনদে"— উক্তিটি বুঝিয়ে লেখো।
গ. উদ্দীপকের ড. আশরাফের অনুভূতির সাথে ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কবির অনুভূতির সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “ড. আশরাফের ডায়েরির শেষ ইচ্ছাটি ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার মূল সুরের সাথে একসূত্রে গাঁথা”— মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

(ক) জ্ঞানমূলক উত্তর।


‘মক্ষিকা’ শব্দের অর্থ হলো— মাছি।

(খ) অনুধাবনমূলক উত্তর।


উক্তিটির প্রেক্ষাপট: প্রশ্নোক্ত চরণে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বঙ্গমাতার কাছে প্রার্থনা করেছেন যেন দেশমাতা তাঁকে তাঁর স্মৃতিরূপ লাল পদ্ম থেকে দূরে ঠেলে না দেন।

কবি নিজেকে ‘মধুসূদন’ (যার নামের অর্থ ফুলের মধু) নামের সাথে তুলনা করে বিনয় প্রকাশ করেছেন। তিনি চান, বঙ্গমাতা যেন তাঁর মনরূপ লাল পদ্মকে সর্বদা কবি-স্মৃতিতে সিক্ত রাখেন, অর্থাৎ কবিকে যেন দেশমাতা কখনো ভুলে না যান।

(গ) প্রয়োগমূলক উত্তর।


উদ্দীপকের ড. আশরাফের অনুভূতি ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কবির প্রবাস জীবনের ভুল বুঝতে পারা এবং মাতৃভূমির প্রতি তীব্র নাড়ির টানের দিকটির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতায় দেখা যায়, কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত যৌবনে খ্যাতির মোহে স্বদেশে ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু প্রবাসে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন যে মাতৃভূমিকে ত্যাগ করা তাঁর মস্ত বড় ভুল ছিল এবং স্বদেশের জন্য তাঁর মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে।

উদ্দীপকের বিজ্ঞানী ড. আশরাফও দীর্ঘ ৩০ বছর প্রবাসে কাটিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেলেও শেষ জীবনে এসে মাতৃভূমির জন্য তীব্র শূন্যতা অনুভব করেছেন। দেশের জন্য কিছু করতে না পারার যে আত্মগ্লানি ও অনুশোচনা বিজ্ঞানীর মাঝে দেখা গেছে, তা কবিতার কবির গভীর দেশপ্রেম ও আত্মোপলব্ধির অনুভূতিরই হুবহু প্রতিফলন।

(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক উত্তর।


ড. আশরাফের শেষ ইচ্ছা এবং ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কবির প্রার্থনা— উভয়ের মূলে রয়েছে মাতৃভূমির কোলে শেষ আশ্রয় পাওয়া এবং অমরতা লাভের আকুল আকাঙ্ক্ষা, তাই মন্তব্যটি সম্পূর্ণ যথার্থ।

‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার মূল সুর হলো— নশ্বর পৃথিবীতে মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু দেশমাতার সেবায় আত্মনিয়োগ করে মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকা সম্ভব। কবি বঙ্গমাতার কাছে আকুল প্রার্থনা জানিয়েছেন যেন তাঁর দোষত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে স্বদেশের মাটিতে স্মরণীয় করে রাখা হয়।

উদ্দীপকের ড. আশরাফও বিদেশে প্রভূত সাফল্য অর্জন করলেও শেষ সময়ে দেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার এবং দেশের মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকার আকুতি প্রকাশ করেছেন। তিনি মাতৃভূমির কাছে নিজের ব্যর্থতার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন, যা কবিতার কবির ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতার সাথে মিলে যায়।

সুতরাং, স্থান, কাল বা পেশার ব্যবধান থাকলেও দেশের মাটির প্রতি মমত্ববোধ এবং মৃত্যুর পর দেশের মানুষের হৃদয়ে স্থান পাওয়ার যে পরম আকুতি, তা উভয় ক্ষেত্রেই এক। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, ড. আশরাফের ডায়েরির শেষ ইচ্ছাটি ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার মূল সুরকেই ধারণ করে।

সৃজনশীল প্রশ্ন - ৫



পদ্মা নদীর পাড়ের এক সাধারণ মাঝি রহমত আলী। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি নিজের নৌকা দিয়ে শত শত শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের নদী পার করে দিয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে তিনি কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা বা সার্টিফিকেটের আশা করেননি, নীরবে আবার হাল ধরেছেন। বৃদ্ধ বয়সে রহমত মাঝি বলেন, "আমি দেশের লাইগা বড় কিছু করতে পারি নাই বাবা, বড় কোনো খেতাবও পাই নাই। কিন্তু মরার পর এই দেশের মানুষ যখন পদ্মা নদীর দিকে তাকাইবো, তখন যেন একটা বারের জন্য হইলেও আমার কথা মনে করে। এই দেশের মাটির গন্ধ পাইয়া যেন আমি কবরে শান্তিতে ঘুমাইতে পারি।"

ক. ‘তামরস’ শব্দের অর্থ কী?
খ. "নীরবধি জপিতেছ এ মিনতি"— বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
গ. উদ্দীপকের রহমত মাঝির আত্মত্যাগ ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কবির দেশপ্রেমের চেয়ে কোন দিক থেকে ভিন্ন? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “রহমত মাঝির শেষ ইচ্ছাটি ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কবির ‘মানসে ফুটে থাকার’ ব্যাকুলতারই নামান্তর”— মন্তব্যটি মূল্যায়ন করো।


(ক) জ্ঞানমূলক উত্তর


‘তামরস’ শব্দের অর্থ হলো— পদ্ম বা পদ্মফুল।

(খ) অনুধাবনমূলক উত্তর


উক্তিটির প্রেক্ষাপট: প্রশ্নোক্ত চরণে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত দূর প্রবাসে বসেও প্রতিনিয়ত মাতৃভূমির প্রতি তাঁর বিনম্র প্রার্থনা ও ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করেছেন।

কবি প্রবাসে থেকেও এক মুহূর্তের জন্যও তাঁর জন্মভূমিকে ভুলতে পারেননি। তিনি মায়ের চরণে দাসের মতো নিজেকে সঁপে দিয়ে অবিরাম এই মিনতি করছেন যেন দেশমাতা তাঁর সব ভুল ক্ষমা করে তাঁকে নিজের হৃদয়ে স্থান দেন।

(গ) প্রয়োগমূলক উত্তর


উদ্দীপকের রহমত মাঝির আত্মত্যাগ সরাসরি দেশের মাটিতে থেকে নিঃস্বার্থ সেবার প্রতীক, যা ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কবির প্রবাস জীবনের মোহগ্রস্ততার দিক থেকে ভিন্ন।

‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতায় কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত যৌবনে স্বদেশের মায়া ত্যাগ করে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন এবং প্রবাসে বসেই তিনি দেশের প্রতি অনুশোচনা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ, কবির দেশপ্রেম জাগ্রত হয়েছে এক প্রকার মোহভঙ্গ ও দূরত্বের পর।

অন্যদিকে, উদ্দীপকের রহমত মাঝি কোনো মোহের বশে দেশ ছাড়েননি; তিনি দেশের ক্রান্তিলগ্নে নিজের জীবন বাজি রেখে সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন। তিনি কোনো খ্যাতি বা প্রতিপত্তির আশা না করে আজীবন দেশের মাটিতেই থেকে গেছেন, যা প্রবাসে থাকা কবির জীবনের অনুশোচনাময় দেশপ্রেম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও বাস্তবমুখী।

(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক উত্তর


রহমত মাঝির সাধারণ জীবন হলেও মৃত্যুর পর মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকার আকুতি ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার কবির অমরতা পাওয়ার ইচ্ছারই অন্য রূপ, তাই মন্তব্যটি অনস্বীকার্য।

‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার শেষ অংশে কবি বঙ্গমাতার কাছে প্রার্থনা করেছেন যে তিনি যেন দেশমাতার ‘মন-কোকনদে’ বা মানুষের ‘স্মৃতি-জলে’ শরৎকালের মধুময় পদ্মফুলের মতো চিরকাল ফুটে থাকতে পারেন। অর্থাৎ, মানুষের মনে স্থায়ী আসন লাভ করাই ছিল কবির পরম চাওয়া।

উদ্দীপকের সাধারণ রহমত মাঝিও দেশের জন্য বীরত্বের কাজ করেও কোনো পার্থিব পুরস্কার চাননি। তাঁর একমাত্র শেষ ইচ্ছা— মরার পর দেশের মানুষ যেন পদ্মা নদীর দিকে তাকিয়ে তাঁকে অন্তত একবার স্মরণ করে এবং দেশের মাটিতে তিনি যেন শান্তিতে ঘুমাতে পারেন। এই সাধারণ মাঝির চাওয়ার মাঝেও মানুষের হৃদয়ে বা ‘মানসে’ বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।

সুতরাং, কবি তাঁর কাব্যের মাধ্যমে মানুষের মনে ফুটে থাকতে চেয়েছেন, আর মাঝি তাঁর নিঃস্বার্থ কর্মের মাধ্যমে মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। প্রকাশের মাধ্যম ভিন্ন হলেও উভয়ের অন্তিম আকাঙ্ক্ষা এক ও অভিন্ন হওয়ায় বলা যায়, রহমত মাঝির শেষ ইচ্ছাটি কবিতার কবির ব্যাকুলতারই নামান্তর।

৩০টি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর


১. ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতাটি কার লেখা?
উত্তর: মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
২. মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম কত সালে?
উত্তর: ১৮২৪ সালে (২৫শে জানুয়ারি)।
৩. মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মস্থান কোথায়?
উত্তর: যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে।
৪. মাইকেল মধুসূদন দত্ত কত সালে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন?
উত্তর: ১৮৪৩ সালে।
৫. খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পর কবির নামের শুরুতে কোন শব্দটি যুক্ত হয়?
উত্তর: মাইকেল।
৬. মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমর কীর্তি বা মহাকাব্যের নাম কী?
উত্তর: মেঘনাদবধ কাব্য।
৭. বাংলা সাহিত্যে প্রথম সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতার রচয়িতা কে?
উত্তর: মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
৮. বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক কে?
উত্তর: মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
৯. ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতাটি কী ধরনের রচনা?
উত্তর: গীতি কবিতা (দেশাত্মবোধক গীতি কবিতা)।
১০. ‘মিনতি’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: প্রার্থনা বা বিনীত আবেদন।
১১. কবি বঙ্গমাতার কাছে কীসের জন্য মিনতি করছেন?
উত্তর: তাঁকে মনে রাখার জন্য বা স্মরণে রাখার জন্য।
১২. ‘পরবাসে’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: বিদেশে বা প্রবাসী জীবনে।
১৩. ‘দৈব’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: ভাগ্য বা বিধিলিপি।
১৪. ‘মনঃ-কোকনদ’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: মনের রূপ লাল পদ্ম।
১৫. ‘মধুহীন করো না গো’— এখানে ‘মধু’ শব্দটি কার নামের অংশকে নির্দেশ করে?
উত্তর: কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের নামের অংশকে।
১৬. কবি জন্মভূমিকে কার সাথে তুলনা করেছেন?
উত্তর: গর্ভধারিণী মায়ের (বঙ্গমাতা) সাথে।
১৭. কবি নিজেকে বঙ্গমাতার কী হিসেবে উল্লেখ করেছেন?
উত্তর: দাস হিসেবে।
১৮. ‘অমৃত-হ্রদ’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: মাতৃভূমির ভালোবাসারূপ পবিত্র ও অমর জলাশয়।
১৯. ‘মক্ষিকা’ শব্দের প্রতিশব্দ কী?
উত্তর: মাছি।
২০. ‘জন্মিলে মরিতে হবে’— এটি কোন ধরনের সত্য?
উত্তর: চিরন্তন বা ধ্রুব সত্য।
২১. কবি কাকে ‘অমর’ বলেছেন?
উত্তর: যিনি দেশের জন্য মহৎ কীর্তি রেখে যান বা যার গুণ আছে।
২২. ‘নদীবহ’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: নদী প্রবাহিত হওয়া বা নদীর স্রোত।
২৩. ‘কাঙাল’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: দীন, দরিদ্র বা গুণহীন।
২৪. কবি বঙ্গমাতার কাছে কী প্রার্থনা করার সাহস পাচ্ছেন না?
উত্তর: অমরতার বর (আশীর্বাদ)।
২৫. ‘শুভগুণ’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: মানুষের কল্যাণকর বা মহৎ গুণাবলি।
২৬. কবি বঙ্গমাতাকে কী অনুরোধ করেছেন?
উত্তর: তাঁর দোষগুলো ভুলে গিয়ে শুধু গুণগুলো মনে রাখতে।
২৭. ‘স্মৃতি-জল’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: মানুষের মনের স্মৃতিরূপ পবিত্র পানি বা মণিকোঠা।
২৮. ‘শরদে’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: শরৎকালে।
২৯. ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতায় কোন ঋতুর উল্লেখ আছে?
উত্তর: শরৎ ও বসন্ত ঋতুর।
৩০. মাইকেল মধুসূদন দত্ত কত সালে মৃত্যুবরণ করেন?
উত্তর: ১৮৭৩ সালে (২৯শে জুন)।


১৫টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর

১. কবি বঙ্গমাতার কাছে কী মিনতি করেছেন এবং কেন?


উত্তর: কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বঙ্গমাতার কাছে মিনতি করেছেন যেন প্রবাসে থাকলেও দেশমাতা তাঁকে সর্বদা মনে রাখেন এবং ভুলে না যান।

পৃথিবীতে মানুষের জীবন নশ্বর এবং মৃত্যু অনিবার্য। কবি প্রবাসে থাকার কারণে স্বদেশের মাটি থেকে দূরে আছেন, তাই তাঁর ভয় হয় পাছে দেশমাতা তাঁকে ভুলে যান। এই বিস্মৃতির হাত থেকে বাঁচতে এবং মাতৃভূমির হৃদয়ে স্থান পেতেই কবি এই ব্যাকুল মিনতি করেছেন।

২. "মধুহীন করো না গো, তব মনঃ-কোকনদে"— উক্তিটি বুঝিয়ে লেখো।


উত্তর: এই উক্তিটির মাধ্যমে কবি বঙ্গমাতার মনরূপ লাল পদ্ম থেকে তাঁর স্মৃতিকে মুছে না ফেলার আকুল আবেদন জানিয়েছেন।

এখানে ‘মধু’ শব্দের দুটি অর্থ রয়েছে— একটি হলো পদ্মফুলের ভেতরের সুমিষ্ট রস বা মধু, এবং অন্যটি হলো স্বয়ং কবি ‘মধুসূদন’। কবি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মায়ের কাছে প্রার্থনা করছেন, ফুল যেমন মধু ছাড়া মলিন হয়ে যায়, তেমনি বঙ্গমাতা যেন তাঁর মন থেকে কবিকে ভুলে গিয়ে তাঁর মন-পদ্মকে ‘মধুহীন’ বা কবি-শূন্য না করেন।

৩. "জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে"— চরণটি দ্বারা কবি কী বুঝিয়েছেন?


উত্তর: এই চরণের মাধ্যমে কবি জাগতিক জীবনের নশ্বরতা এবং মৃত্যুর অনিবার্যতার চিরন্তন সত্যকে প্রকাশ করেছেন।

পৃথিবীতে প্রতিটি জীবকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে; কেউই এখানে চিরকাল বেঁচে থাকার জন্য আসেনি। কবি এই সত্যকে মেনে নিয়ে বলতে চেয়েছেন যে, শারীরিক মৃত্যু যেহেতু নিশ্চিত, তাই মানুষের এমন কিছু কীর্তি রেখে যাওয়া উচিত যা তাকে মৃত্যুর পরও মানুষের মনে বাঁচিয়ে রাখবে।

৪. "নাহি খেদ তাহে, যদি মহী-বক্ষে ফোটে"— কবির এই উক্তির তাৎপর্য কী?


উত্তর: কবি বুঝিয়েছেন যে, যদি তিনি দেশের মানুষের মনে বেঁচে থাকতে পারেন, তবে অসময়ে শারীরিক মৃত্যু হলেও তাঁর কোনো দুঃখ বা আফসোস থাকবে না।

কবি জানেন যে মানুষের জীবন প্রদীপের মতো যেকোনো সময় নিভে যেতে পারে। কিন্তু যদি তিনি তাঁর সৃষ্টি বা কর্মের মাধ্যমে মাতৃভূমির বুকে বা জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারেন, তবে সেই মৃত্যুকে তিনি আনন্দের সাথে মেনে নেবেন।

৫. "মক্ষিকাও গলে না গো, পড়িলে অমৃত-হ্রদে"— উক্তিটির অন্তর্নিহিত ভাব ব্যাখ্যা করো।


উত্তর: উক্তিটির অন্তর্নিহিত ভাব হলো— মাতৃভূমির অকৃত্রিম ভালোবাসার মাঝে স্থান পাওয়া মানুষ কখনো কালের গহ্বরে হারিয়ে যায় না বা বিস্মৃত হয় না।

সাধারণত মাছি কোনো তরলে পড়লে পচে বা গলে যায়, কিন্তু তা যদি অমৃতের হ্রদ হয় তবে মাছিটি রক্ষা পায়। একইভাবে, কোনো সাধারণ মানুষও যদি দেশমাতার সেবা করে তাঁর হৃদয়ে বা অমৃতরূপ ভালোবাসায় স্থান পায়, তবে সে সমাজে চিরস্মরণীয় ও অমর হয়ে থাকে।

৬. কবি বঙ্গমাতার কাছে অমরতার বর চাইতে লজ্জা বা কুণ্ঠা বোধ করছেন কেন?


উত্তর: নিজের কোনো বিশেষ গুণ বা মহৎ কীর্তি নেই বলে উপলব্ধি করায় কবি অমরতার বর চাইতে কুণ্ঠা বোধ করছেন।

কবি মনে করেন, সমাজে কেবল সেই ব্যক্তিই অমরতা পাওয়ার যোগ্য যার অসাধারণ শুভগুণ বা দেশসেবার মহৎ রেকর্ড রয়েছে। কবি খ্যাতির মোহে মাতৃভূমি ছেড়ে প্রবাসে কাটিয়েছেন, তাই তিনি নিজেকে গুণহীন ও অতি সাধারণ মনে করে মায়ের কাছে সরাসরি অমরতার দাবি করতে লজ্জা পাচ্ছেন।

৭. "মুছিয়া লও হে মাগো, মোর যত দোষ"— কবি কেন এই প্রার্থনা করেছেন?


উত্তর: কবি প্রবাসে গিয়ে মাতৃভূমিকে ভুলে থাকার যে ভুল করেছিলেন, সেই অপরাধ বা দোষ মার্জনা করার জন্য বঙ্গমাতার কাছে এই প্রার্থনা করেছেন।

যৌবনের মোহে কবি স্বদেশের মায়া ত্যাগ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন, যা ছিল তাঁর জীবনের এক মস্ত বড় ভুল। স্বদেশে ফিরে না আসতে পারার এই গ্লানি থেকে মুক্ত হতে তিনি মায়ের কাছে সন্তানের মতো আবদার করেছেন যেন মা তাঁর সমস্ত দোষ মুছে দিয়ে কেবল স্নেহে আগলে রাখেন।

৮. "যদি তুমি গুণ কর, পরমাদ হীন কর"— চরণটি বুঝিয়ে লেখো।


উত্তর: এই চরণে কবি প্রার্থনা করেছেন যেন বঙ্গমাতা দয়াপরবশ হয়ে কবির সাধারণ কাজকে ‘গুণ’ হিসেবে বিবেচনা করেন এবং তাঁর সব ভুলত্রুটি বা প্রমাদ ক্ষমা করেন।

সন্তানের হাজারো ভুল মা যেমন ক্ষমা করে দেন, কবিও বঙ্গমাতাকে সেই মায়ের আসনে বসিয়েছেন। তিনি চান দেশমাতা যেন তাঁর দোষগুলোকে বড় করে না দেখে তাঁর সামান্য গুণটুকুকে গ্রহণ করেন এবং তাঁর জীবনকে ভুলভ্রান্তিমুক্ত ও সার্থক করে তোলেন।

৯. ‘স্মৃতি-জলে’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?


উত্তর: ‘স্মৃতি-জলে’ বলতে কবি মাতৃভূমির সাধারণ মানুষের মনের মনিকোঠা বা স্মৃতিরূপ পবিত্র জলাশয়কে বুঝিয়েছেন।

পদ্মফুল যেমন পরিষ্কার পানিতে ফুটে ওঠে এবং চারদিকের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়, কবিও তেমনি দেশের মানুষের ভালোবাসাময় স্মৃতির মাঝে বেঁচে থাকতে চান। মানুষের মনে স্থান পাওয়াকেই কবি পবিত্র জলের সাথে তুলনা করেছেন যেখানে তাঁর অস্তিত্ব সতেজ থাকবে।

১০. "যথা ফলি মধুময় তামরস"— চরণটির তাৎপর্য কী?


উত্তর: এই চরণের মাধ্যমে কবি মাতৃভূমির হৃদয়ে শরৎকালের প্রস্ফুটিত পদ্মফুলের মতো সুন্দর ও সতেজভাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

‘তামরস’ মানে পদ্মফুল। শরৎকালের পদ্ম যেমন মধু ও সৌন্দর্যে ভরপুর থাকে, কবিও চান তাঁর সাহিত্যকর্ম ও দেশপ্রেম যেন দেশের মানুষের মনে চিরকাল সেই মধুময় পদ্মফুলের মতোই আনন্দ ও প্রেরণা জোগায়, যা কখনো বাসি বা মলিন হবে না।

১১. ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতায় কবির তীব্র অনুশোচনাবোধ কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে?


উত্তর: কবিতার কবি প্রবাস জীবনকে তাঁর জীবনের এক পরম ‘কোকনদ’ বা মনের ভুল হিসেবে স্বীকার করে তীব্র অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন।

যৌবনের শুরুতে কবি ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এবং খ্যাতির মোহে দেশ ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু প্রবাসের যান্ত্রিক জীবনে তিনি বুঝতে পারেন যে স্বদেশের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কিছুই নেই। এই মাতৃভূমিকে অবহেলা করার যে বেদনা, তা-ই তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে অনুশোচনা হয়ে ঝরে পড়েছে।

১২. কবি নিজেকে ‘দাস’ এবং জন্মভূমিকে ‘মা’ বলেছেন কেন?


উত্তর: মাতৃভূমির প্রতি পরম ভক্তি, শ্রদ্ধা এবং নিজের বিনম্র আত্মসমর্পণকে প্রকাশ করার জন্যই কবি নিজেকে ‘দাস’ এবং জন্মভূমিকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেছেন।

একটি সন্তানের কাছে তার মা যেমন পরম পূজনীয় এবং মায়ের সামনে সন্তান যেমন সম্পূর্ণ অহংকারহীন, কবির কাছেও তাঁর দেশমাতা ঠিক তেমনি। নিজের সমস্ত অহংকার বিসর্জন দিয়ে দেশের চরণে নিজেকে নিবেদন করতেই তিনি এই রূপক ব্যবহার করেছেন।

১৩. "ফুটি যেন স্মৃতি-জলে, মানসে"— বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?


উত্তর: এর অর্থ হলো কবি মানুষের মন এবং স্মৃতির মাঝে চিরকাল সতেজ ও জাগ্রত হয়ে বেঁচে থাকতে চান।

শারীরিক মৃত্যুর পর মানুষ চিরতরে হারিয়ে যায়, কিন্তু তার ভালো কাজ মানুষের মনে থেকে যায়। কবি চান তাঁর সৃষ্টি ও দেশপ্রেম যেন বাঙালির মানসপটে (মনে) এবং স্মৃতির পাতায় চিরকাল পদ্মফুলের মতো প্রস্ফুটিত থাকে।

১৪. ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার মূল চেতনাটি ব্যাখ্যা করো।


উত্তর: ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার মূল চেতনা হলো— প্রগাঢ় ও নিস্পৃহ দেশপ্রেম এবং মৃত্যুর পরও মাতৃভূমির হৃদয়ে অমর হয়ে থাকার ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা।

কবি প্রবাসে গিয়ে তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং স্বদেশের প্রতি গভীর নাড়ির টান অনুভব করেছেন। নিজের কোনো বড় গুণ না থাকলেও কেবল মায়ের অকৃত্রিম স্নেহের জোরেই তিনি দেশের মানুষের হৃদয়ে স্থান পেতে চেয়েছেন— এটাই কবিতার মূল চেতনা।

১৫. কবি কেন অসময়ের মৃত্যুকেও ভয় পান না?


উত্তর: কবি যদি দেশের মানুষের ভালোবাসা ও স্মৃতির মাঝে বেঁচে থাকতে পারেন, তবে তিনি অসময়ের মৃত্যুকেও ভয় পান না।

কবি বিশ্বাস করেন যে, মৃত্যুর পর যদি কেউ মানুষের মনে বেঁচে থাকে, তবে তার সেই মৃত্যুই আসলে প্রকৃত জীবন বা অমরতা। তাই মাতৃভূমির স্মৃতিরূপ পবিত্র হ্রদে স্থান পেলে তিনি যেকোনো সময় মৃত্যুবরণ করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত।


বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার মূলভাব, লাইনের ব্যাখ্যা ও শব্দার্থ-টীকা সৃজনশীল সহ।

‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতায় অনুশোচনা ও অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা। ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ মাইকেল মধুসূদন দত্ত উৎস: কবিতাটি কবির ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’ থেকে সংকলিত (এটি একটি গীতিঅ্যাস)। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার সম্পূর্ণলেকচা…

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন