নামাজের সকল দোয়া ও জিকির: আরবি উচ্চারণ ও বাংলা অর্থসহ পূর্ণাঙ্গ গাইড
নামাজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে দ্বিতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সঠিক নিয়মে নামাজ আদায়ের জন্য নামাজের ভেতরের দোয়া ও জিকিরগুলো বিশুদ্ধভাবে জানা জরুরি। আজকের ব্লগে আমরা নামাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সকল দোয়া আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ আলোচনা করব।১. তাকবীরে তাহরিমা ও ছানা (নামাজের শুরু)
নামাজ শুরু করার সময় 'আল্লাহু আকবার' বলে হাত বাঁধার পর প্রথমেই ছানা পড়তে হয়।
আরবি:
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، وَتَبَارَكَ اسْمُكَ، وَتَعَالَى جَدُّكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ
উচ্চারণ: সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা, ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি। আপনার নাম বরকতময়, আপনার মহিমা অতি উচ্চ এবং আপনি ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই।
২. রুকুর তাসবীহ
রুকুতে গিয়ে কমপক্ষে তিনবার এই তাসবীহ পড়তে হয়।
আরবি: سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ
উচ্চারণ: সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম।
অর্থ: আমার মহান রবের পবিত্রতা বর্ণনা করছি।
৩. রুকু থেকে ওঠার দোয়া
রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সময় ইমাম ও একাকী নামাজি বলবেন:
আরবি: سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ
উচ্চারণ: সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ।
অর্থ: আল্লাহ তার কথা শোনেন, যে তাঁর প্রশংসা করে।
সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলবেন:
আরবি: رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: রাব্বানা লাকাল হামদ।
অর্থ: হে আমাদের রব! সকল প্রশংসা কেবল আপনারই।
৪. সিজদার তাসবীহ
সিজদায় গিয়ে কমপক্ষে তিনবার এই তাসবীহ পড়তে হয়।
আরবি: سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى
উচ্চারণ: সুবহানা রাব্বিয়াল আলা।
অর্থ: আমার অতি উচ্চ রবের পবিত্রতা ঘোষণা করছি।
৫. দুই সিজদার মাঝখানের দোয়া।
প্রথম সিজদা দিয়ে উঠে সোজা হয়ে বসে এই দোয়াটি পড়া সুন্নাত।
আরবি: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَاهْدِنِي، وَاجْبُرْنِي، وَعَافِنِي، وَارْزُقْنِي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফিরলি, ওয়ারহামনি, ওয়াহদিনি, ওয়াজবুরনি, ওয়া আফিনি, ওয়ারজুকনি।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমাকে হেদায়েত দিন, আমার ক্ষতি পূরণ করে দিন, আমাকে নিরাপত্তা দিন এবং আমাকে রিজিক দান করুন।
৬. তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যাতু।
নামাজের দ্বিতীয় বা শেষ রাকাতে বসা অবস্থায় এটি পড়তে হয়।
আরবি:
التَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ، السَّلامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ، السَّلامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ، أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
উচ্চারণ: আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত তায়্যিবাতু, আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহীন। আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।
অর্থ: যাবতীয় সম্মান, উপাসনা ও পবিত্রতা আল্লাহর জন্য। হে নবী! আপনার প্রতি শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। আমাদের প্রতি এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।
৭. দরুদ শরীফ (দরুদে ইব্রাহিম)
শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর এটি পড়তে হয়।
আরবি:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُহَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমনটি করেছিলেন ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর বরকত বর্ষণ করুন, যেমনটি করেছিলেন ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।
৮. দোয়া মাসুরা
সালাম ফেরানোর আগে এটি পড়তে হয়।
আরবি:
اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ، فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি জালামতু নাফসি জুলমান কাসিরাওঁ ওয়ালা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা, ফাগফিরলি মাগফিরাতাম মিন ইনদিকা ওয়ারহামনি ইন্নাকা আনতাল গাফুরুর রাহিম।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আমার নিজের ওপর অনেক জুলুম করেছি, আর আপনি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার কেউ নেই। অতএব আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার প্রতি দয়া করুন। নিশ্চয়ই আপনি পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
৯. দোয়া কুনুত (বেতরের নামাজের জন্য)
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাস্তাইনকা, ওয়ানাস্তাগফিরুকা, ওয়ানু'মিনু বিকা, ওয়ানাতাওয়াক্কালু আলাইকা, ওয়ানুসনি আলাইকাল খাইরা, ওয়ানাশকুরুকা, ওয়ালা নাকফুরুকা, ওয়ানাখলাউ, ওয়ানাতরুকু মাই ইয়াফজুরুকা। আল্লাহুম্মা ইয়্যাকা নাবুদু ওয়ালাকা নুসল্লি ওয়ানাসজুদু ওয়াইলাইকা নাসআ ওয়া নাহফিদু ওয়ানারজু রাহমাতাকা ওয়ানাকশা আজাবাকা ইন্না আজাবাকা বিল কুফফারি মুলহিক।
২. নামাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ১০টি ছোট সূরা
নামাজে সূরা ফাতিহার সাথে মিলানোর জন্য এই ছোট সূরাগুলো জানা অত্যন্ত জরুরি।
সূরা আল-ফাতিহা
এটি নামাজের মূল সূরা। এর অনুবাদ জানলে নামাজে একাগ্রতা বাড়ে।
- অর্থ: যাবতীয় প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। যিনি অত্যন্ত দয়ালু ও পরম করুণাময়। যিনি বিচার দিবসের মালিক। আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি এবং কেবল আপনারই সাহায্য চাই। আমাদের সরল পথ দেখান। তাঁদের পথ, যাদের আপনি নেয়ামত দিয়েছেন।
সূরা আল-ইখলাস
- উচ্চারণ: কুল হুয়াল্লাহু আহাদ। আল্লাহু সামাদ। লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ। ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুয়ান আহাদ।
- অর্থ: বলুন, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। আর তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।
সূরা আল-কাওসার
- উচ্চারণ: ইন্না আতাইনা কাল কাওসার। ফাসাল্লি লিরাব্বিকা ওয়ানহার। ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার।
- অর্থ: নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাওসার দান করেছি। অতএব আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন। নিশ্চয়ই আপনার শত্রুই নির্বংশ।
সূরা আল-আসর
- উচ্চারণ: ওয়াল আসর। ইন্নাল ইনসানা লাফী খুসর। ইল্লাল্লাযীনা আমানু ওয়া আমিলুস সালিহাতি ওয়া তাওয়াসাও বিল হাক্কি ওয়া তাওয়াসাও বিস সাবর।
- অর্থ: সময়ের কসম! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। কিন্তু তারা ব্যতীত, যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে এবং একে অপরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।
সূরা আন-নাস
- উচ্চারণ: কুল আউযু বিরাব্বিন নাস। মালিকিন নাস। ইলাহিন নাস। মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খাননাস। আল্লাযী ইউওয়াসউিসু ফী সুদূরিন নাস। মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস।
- অর্থ: বলুন, আমি আশ্রয় চাই মানুষের পালনকর্তার, মানুষের অধিপতির, মানুষের উপাস্যের—কুমন্ত্রণাদাতা আত্মগোপনকারীর অনিষ্ট থেকে, যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়।
উপসংহার
নামাজের এই দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করলে ইবাদতে একাগ্রতা আসে এবং নামাজের সওয়াব বৃদ্ধি পায়। এই ব্লগের প্রতিটি দোয়া বিশুদ্ধ উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
