...

আম-আঁটির ভেঁপু।বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। SSC | দাখিল | ভোকেশনাল।নবম দশম শ্রেণী।


আম-আঁটির ভেঁপু।বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।


আম-আঁটির ভেঁপু।বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিগত পাঠগুলোতে আমরা 'বই পড়া', 'নিম গাছ', 'প্রত্যুপকার', 'জীবন বিনিময়' এবং 'একুশের গল্প'-এর মতো জীবনঘনিষ্ঠ ও দেশপ্রেমমূলক রচনার গভীর জীবনবোধ নিয়ে আলোচনা করেছি। সেই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা গ্রামীণ বাংলার ধূলিকণা আর শৈশবের অমলিন স্মৃতির আখ্যান বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী গল্প 'আম-আঁটির ভেঁপু' নিয়ে বিস্তারিত জানব। এই গল্পটি আমাদের যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করে পুনরায় সেই সহজ-সরল মাটির কাছাকাছি নিয়ে যাবে, যেখানে অভাবের মাঝেও লুকিয়ে থাকে অবারিত আনন্দ।


লেখক পরিচিতি: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

  জন্ম ও মৃত্যু: তিনি ১৮৯৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৫০ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

 সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য: বিভূতিভূষণ ছিলেন মূলত প্রকৃতির কবি। মানুষের জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির যে নিবিড় যোগাযোগ, তা তাঁর মতো করে আর কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারেননি। তাঁর লেখায় অতি সাধারণ মানুষের অভাব-অনটন, স্বপ্ন এবং গ্রামবাংলার অপরূপ রূপ ফুটে ওঠে।

 বিখ্যাত গ্রন্থ: তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি 'পথের পাঁচালী' ও 'অপরাজিত'। এছাড়াও 'আরণ্যক', 'ইছামতী' এবং ছোটগল্প 'পুঁইমাচা' তাঁর অনন্য সৃষ্টি। 'আম-আঁটির ভেঁপু' মূলত তাঁর 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসেরই একটি অংশ।

গল্পের  কাহিনি সংক্ষেপ:

গল্পটি গ্রামীণ বাংলার এক হতদরিদ্র কিন্তু স্বপ্নাতুর পরিবারের দুই ভাই-বোন অপু ও দুর্গার শৈশব নিয়ে। দুপুরের রোদে যখন মা সর্বজয়া কাজে ব্যস্ত, তখন দুর্গা বাগান থেকে কুড়িয়ে আনা কচি আম নিয়ে আসে। অপু তার টিনের বাক্স থেকে তেল ও নুন চুরি করে এনে সেই আম মাখে। তাদের এই সাধারণ আহারের আনন্দ কোনো রাজকীয় ভোজের চেয়ে কম নয়।

গল্পের পরবর্তী অংশে আমরা দেখি অপুর খেলনার জগত। তার ভাঙা টিনের বাক্সে জমানো কিছু কড়ি, খাপরার কুচি আর একটি আমের আঁটি দিয়ে তৈরি বাঁশি (ভেঁপু)। এই তুচ্ছ জিনিসগুলোই অপুর কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। গল্পের শেষে যখন তাদের মা দুর্গার চঞ্চলতা নিয়ে শাসন করে, তখন শৈশবের সেই ভয় আর আনন্দের এক চমৎকার মিশ্রণ তৈরি হয়।

গল্পের মূল বিষয় ।

​এই গল্পের মূল ভিত্তি হলো 'শৈশবের চিরন্তন আনন্দ ও প্রকৃতির সাথে মানিয়ে নেওয়া'। লেখক এখানে দেখাতে চেয়েছেন যে, বৈষয়িক অভাব বা দারিদ্র্য শিশুদের মনের আনন্দকে কেড়ে নিতে পারে না।

বিস্ময় ও কৌতূহল: অপুর চরিত্রটির মাধ্যমে লেখক শিশুর চিরন্তন বিস্ময়বোধকে তুলে ধরেছেন। তার কাছে একটি সামান্য খাপরার কুচি বা আমের আঁটি মহামূল্যবান।

​ভাই-বোনের শাশ্বত সম্পর্ক: দুর্গা ও অপুর সম্পর্কটি খুনসুটি, মায়া এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে। বড় বোন হিসেবে দুর্গা অপুর পথপ্রদর্শক এবং রক্ষক।

​প্রকৃতির পটভূমি: গল্পের প্রতিটি ঘটনা প্রকৃতির কোলে আবর্তিত। আম বাগান, বাঁশঝাড় আর দুপুরের রোদেলা দুপুর—সবই গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বিস্তারিত কাহিনি প্রবাহ

​গল্পের কাহিনি মূলত কয়েকটি স্তরে বিভক্ত। প্রতিটি স্তর অপু ও দুর্গার জীবনের একেকটি খণ্ডচিত্র তুলে ধরে:

​১. চুরির আনন্দ ও লুকোচুরি:

​গল্পের শুরু হয় এক অলস দুপুরে। মা সর্বজয়া যখন ঘাটে বাসন মাজতে গেছেন, তখন দুর্গা চুপি চুপি বাগান থেকে কচি আম কুড়িয়ে আনে। অপুর দায়িত্ব পড়ে ঘর থেকে তেল আর নুন জোগাড় করার। মায়ের ভয়ে তারা অত্যন্ত সন্তর্পণে এই 'নিষিদ্ধ' আম মাখে। আম খাওয়ার সময় অপুর চিবানোর শব্দ যেন ধরা না পড়ে, দুর্গা সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখে। এই সাধারণ আম মাখা তাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার হয়ে ওঠে।

​২. অপুর জাদুর বাক্স:

​অপুর একটি পুরনো টিনের বাক্স আছে। এই বাক্সটি আসলে তার কল্পনার জগত। সেখানে আছে:
​একটি রঙ-ওঠা কাঠের ঘোড়া।
​এক পয়সা দামের একটি টিনের বাঁশি (আম-আঁটির ভেঁপু)।
​গঙ্গা-যমুনার খেলার খাপরার কুচি।
​রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া নাটাফল। এই খেলনাগুলো দিয়ে সে যখন তার ঘরের জানালার পাশে বসে খেলে, তখন তার মনে হয় সে এক বিশাল রাজ্যের মালিক। বাইরের জগত থেকে সে তখন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

৩. দুর্গার চঞ্চলতা ও মায়ের শাসন:

​দুর্গা সারাদিন বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। তার চুল রুক্ষ, পায়ের গোড়ালি ফাটা, কিন্তু তার চোখে এক অদ্ভুত চপলতা। সে প্রায়ই পাড়ার বাগান থেকে ফল চুরি করে আনে। মা সর্বজয়া যখন বিষয়টি টের পান, তখন অভাবের যন্ত্রণায় তিনি রুক্ষ হয়ে ওঠেন এবং দুর্গাকে শাসন করেন। মায়ের এই কঠোরতা আসলে অভাবী জীবনের বহিঃপ্রকাশ, যেখানে একটি থালা হারিয়ে যাওয়া বা কারো বাগান থেকে ফল আনাও বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।


৪. বৃষ্টির দিনের স্মৃতি ও শৈশব:

​গল্পের এক পর্যায়ে বৃষ্টির বর্ণনায় দেখা যায়, বৃষ্টির দিনে জানালার শিক (গড়াদ) ধরে অপু বাইরের প্রকৃতির দিকে চেয়ে থাকে। তার মনে তখন অদ্ভুত সব কল্পনা ভিড় করে। সেই ভেজা মাটির গন্ধ আর বৃষ্টির শব্দ তার কাছে এক রূপকথার মতো মনে হয়।


৫. সমাপ্তি ও ভেঁপুর সুর:

​গল্পের শেষ দিকে দেখা যায়, দারিদ্র্য তাদের ঘিরে ধরলেও অপু তার সেই আম-আঁটির ভেঁপুটি ছাড়েনি। এই ভেঁপুটি আসলে তার শৈশবের স্বাধীনতার প্রতীক। দিদির মায়া আর নিজের কল্পনা নিয়ে অপু যে জগতে বাস করে, সেখানে অভাব আছে ঠিকই, কিন্তু বিষণ্নতা নেই।


​কাহিনির সারকথা

​পুরো কাহিনিটি একটি সহজ সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে— "মানুষের বড় সম্পদ তার কল্পনাশক্তি"। অপু-দুর্গার কাছে একটি দামী প্লাস্টিকের খেলনার চেয়ে আমের আঁটি দিয়ে বানানো বাঁশিটি বেশি আপন, কারণ এর সাথে জড়িয়ে আছে তাদের নিজের হাতে গড়া শৈশব আর গ্রামবাংলার সোঁদা মাটির ঘ্রাণ।

চরিত্র বিশ্লেষণ।

 অপু: সে কৌতূহলী এবং কল্পনাপ্রবণ। দিদির প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস। দারিদ্র্য তাকে স্পর্শ করলেও তার মনের ভেতর এক বিশাল জগত আছে, যেখানে সে তার খেলনাগুলো নিয়ে রাজা।


 দুর্গা: সে চঞ্চল, সাহসী এবং প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা এক কিশোরী। সে কেবল অভাবী ঘরের মেয়ে নয়, সে অপুর রক্ষক ও সাথী। তার চারিত্রিক দৃঢ়তা ফুটে ওঠে যখন সে শাসন সয়েও ভাইয়ের জন্য খাবার জোগাড় করে।


 সর্বজয়া: তিনি চিরন্তন বাঙালি মা। অভাবের তাড়নায় তিনি মাঝে মাঝে কঠোর হন, সন্তানদের বকুনি দেন, কিন্তু অন্তরে সন্তানদের জন্য তাঁর গভীর মমতা ফল্গুধারার মতো প্রবাহিত।


 হরিহর: তিনি আদর্শবাদী কিন্তু কর্মবিমুখ পিতা। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হলেও তিনি তাঁর ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দেন না।


 লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তব জীবনের শিক্ষা

লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি:

বিভূতিভূষণ এই গল্পে দেখাতে চেয়েছেন যে, আনন্দ কোনো বিলাসিতার বস্তু নয়। মানুষের সুখ তার মনের ওপর নির্ভর করে। তিনি প্রকৃতির তুচ্ছ উপাদান—যেমন বনের ফল, সাধারণ বাঁশি বা মাটির কড়িকে শিশুদের চোখে অমূল্য করে তুলে ধরেছেন। লেখকের দৃষ্টিতে শৈশব হলো বাঁধনহারা এবং প্রকৃতি হলো মানুষের আদিম আশ্রয়স্থল।


বাস্তব জীবনের শিক্ষা:

১. সন্তোষ : অল্পতে সন্তুষ্ট থাকার শিক্ষা এই গল্প থেকে পাওয়া যায়। আজকের ভোগবাদী যুগে যেখানে মানুষ দামী খেলনা বা গ্যাজেটের পেছনে ছোটে, সেখানে অপু-দুর্গার আনন্দ আমাদের শিখিয়ে দেয় প্রকৃত সুখ অতি সাধারণ জিনিসেও সম্ভব।


২. পারিবারিক বন্ধন: ভাই-বোনের খুনসুটি এবং একে অপরের প্রতি টান এই গল্পের এক বড় শিক্ষা। কঠিন সময়েও পরিবারই যে বড় শক্তি, তা এখানে প্রতিফলিত হয়েছে।


৩. প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান: যান্ত্রিক জীবনের বাইরে প্রকৃতির কোলে যে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়, তা লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।


বাস্তব জীবনে শিক্ষার প্রতিফলন।

বর্তমান সময়ে এই গল্পের প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম:

 মানসিক প্রশান্তি: আমরা যদি অপুর মতো ছোট ছোট অর্জনে আনন্দ খুঁজে নিতে পারি, তবে আমাদের মানসিক অবসাদ অনেকটাই কমে যাবে।


 সহানুভূতি: অপু-দুর্গার জীবনের অভাব আমাদের সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায়।


 শৈশব রক্ষা: আধুনিক ডিজিটাল আসক্তির যুগে শিশুদের প্রকৃতির কাছে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের কল্পনাশক্তিকে বিকশিত করার গুরুত্ব এই গল্পটি পুনরায় মনে করিয়ে দেয়।


গল্পের কিছু চুম্বক অংশ বা ঘটনা ব্যাখ্যা ও উদাহরণসহ। 

১. আম মাখার গোপন বিলাস (গোপন আনন্দ)।

গল্পের সবচেয়ে জীবন্ত দৃশ্য হলো অপু ও দুর্গার চুপিচুপি আম মাখা খাওয়ার ঘটনা। এটি কেবল খাওয়ার দৃশ্য নয়, এটি বড়দের শাসন এড়িয়ে ছোটদের নিজস্ব এক জগত তৈরির গল্প।
 * ঘটনা: দুর্গা যখন বাগান থেকে কচি আম কুড়িয়ে আনে, সে অপুকে বলে— "তোর বাক্সের তেল আর একটু নুন আনতে পারিস?" অপু ভয়ে ভয়ে তেল ও নুন চুরি করে আনে। তারা জানত ধরা পড়লে মায়ের বকুনি নিশ্চিত, তবুও সেই ভয়কে জয় করেই তাদের আনন্দ।
 * ব্যাখ্যা: এখানে 'তেল-নুন' হলো অভাবের সংসারে বিলাসিতা, আর 'আম' হলো প্রকৃতির দান। শিশুদের কাছে নিজেরা জোগাড় করে খাওয়াটা এক ধরণের অভিযান বা 'অ্যাডভেঞ্চার'।

২. অপুর তেলের ভাঁড় ও কড়ির খেলা (কল্পনার জগত)।

অপুর ভাঙা টিনের বাক্সটি তার কাছে এক জাদুর সিন্দুক। সেখানে কোনো দামী হীরা-জহরত নেই, কিন্তু আছে অসীম কল্পনা।

 * ঘটনা: অপুর বাক্সে ছিল এক পয়সা দামের বাঁশি, গোটা কয়েক শুকনো নাটাফল আর কিছু খাপরার কুচি। সে জানালার শিক (গড়াদ) ধরে বসে সেই খাপরাগুলোকে দামী রত্ন মনে করে খেলা করত।
 * ব্যাখ্যা: এটি শিশুর 'কল্পনাপ্রবণতা' প্রকাশ করে। বড়রা যেটিকে আবর্জনা মনে করে ফেলে দেয়, শিশুর চোখে সেটিই শ্রেষ্ঠ খেলনা। বাস্তব জীবনের কঠোরতা থেকে বাঁচতে শিশুরা নিজেদের মনে এক রূপকথার জগত বানিয়ে নেয়।

৩. দুর্গার 'দত্যি-দানব' রূপ ও দিদির মমতা (ভাই-বোনের সম্পর্ক)।

দুর্গাকে মা সারাদিন বকতেন তার চঞ্চলতার জন্য। কিন্তু অপুর চোখে দুর্গা ছিল এক বীর যোদ্ধা, যে সব বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করে।

 * ঘটনা: মা যখন অপুকে ডাকতেন, দুর্গা তখন ইশারায় অপুকে চুপ থাকতে বলত যাতে তাদের আমের আঁটি চিবানোর শব্দ মা না শোনেন। আবার বকুনি খাওয়ার ভয় থাকলেও দুর্গা নিজের ভাগের আম ভাইকে দিয়ে দিত।
 * ব্যাখ্যা: এখানে দুর্গার চরিত্রে 'মাতৃত্ব' ও 'মমতা' কাজ করে। সে নিজে কষ্ট সইলেও ভাইকে আগলে রাখতে চায়। গ্রামীণ বাংলার বড় বোনদের এই চিরন্তন রূপটিই লেখক এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন।

৪. "একটু চিনি আনতে পারিস?" (অভাবের গভীরতা)।

গল্পের একটি খুব ছোট লাইন কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক করুণ বাস্তবতা।
 * ঘটনা: আম মাখার সময় দুর্গা অপুকে জিজ্ঞেস করেছিল সে একটু চিনি বা গুড় জোগাড় করতে পারবে কি না। অপু নিরুপায় হয়ে বলেছিল যে চিনি মা যে পাত্রে রাখে সেটি সে নাগাল পায় না।
 * ব্যাখ্যা: এই সাধারণ কথাটি দিয়ে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন যে, সেই পরিবারে চিনি বা গুড় কতটুকু দুর্লভ ছিল। এটি দারিদ্র্যের এক নিদারুণ ছবি, যেখানে সামান্য চিনিও শিশুদের কাছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।


৫. আম-আঁটির ভেঁপুর সুর (স্বাধীনতার প্রতীক)।

গল্পের শিরোনাম যে ভেঁপু বা বাঁশিকে নিয়ে, সেটিই অপুর আনন্দের মূল কেন্দ্র।

 * ঘটনা: আমের আঁটি শুকিয়ে ঘষে ঘষে অপু যে ভেঁপুটি বানিয়েছিল, সেটি বাজালে যে কর্কশ শব্দ হতো, তাতেই অপু স্বর্গীয় আনন্দ পেত। সে তার সারা দুপুরের একাকীত্ব দূর করত এই ভেঁপুর সুর দিয়ে।

 * ব্যাখ্যা: এই 'ভেঁপু' হলো জীবনের জয়গান। চারদিকে অভাব, দারিদ্র্য আর শাসন থাকলেও শিশুমন তার নিজের আনন্দের পথ খুঁজে নেয়। এটি মানুষের জীবনীশক্তির প্রতীক।
বাস্তব জীবনে এর প্রতিফলন ও উদাহরণ।
আজকের যুগে আমরা হয়তো দামী গ্যাজেট বা ভিডিও গেম নিয়ে ব্যস্ত, কিন্তু 'আম-আঁটির ভেঁপু' আমাদের মনে করিয়ে দেয়:
 * উদাহরণ ১: একটি শিশু যখন দামী খেলনার চেয়ে কাগজের নৌকা বা বৃষ্টির জলে পা ভেজানোতে বেশি আনন্দ পায়, সেখানেই অপুর চরিত্রটি বেঁচে থাকে।
 * উদাহরণ ২: অভাবী ঘরে যখন দুই ভাই-বোন একটি বিস্কুট ভাগ করে খায়, সেখানে দুর্গার সেই ত্যাগের প্রতিফলন ঘটে।

আম-আঁটির ভেঁপু: গুরুত্বপূর্ণ ২০টি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর

​বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসের অংশ বিশেষ 'আম-আঁটির ভেঁপু' বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। পরীক্ষায় কমন পাওয়ার উপযোগী ২০টি প্রশ্ন নিচে তুলে ধরা হলো:


কাহিনি ও চরিত্র বিষয়ক প্রশ্ন

১. 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পটি কোন উপন্যাস থেকে নেওয়া হয়েছে?

উত্তর: 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পটি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস 'পথের পাঁচালী' থেকে নেওয়া হয়েছে।

২. অপুর বাক্সের চাকাটা কিসের তৈরি ছিল?

উত্তর: অপুর বাক্সের চাকাটা ছিল একটি নাটাফলের তৈরি।

৩. অপুর ভাঙা টিনের বাক্সের দাম কত ছিল?

উত্তর: অপুর ভাঙা টিনের বাক্সটির দাম ছিল এক পয়সা

৪. দুর্গার বয়স কত বছর ছিল?

উত্তর: গল্পের বর্ণনা অনুযায়ী দুর্গার বয়স ছিল ১০-১১ বছর

৫. অপুর বর্তমান বয়স কত?

উত্তর: অপুর বর্তমান বয়স ছিল আট বছর

৬. অপু ও দুর্গার বাবার নাম কী?

উত্তর: অপু ও দুর্গার বাবার নাম হরিহর রায়

৭. হরিহর রায়ের আদি নিবাস কোথায় ছিল?

উত্তর: হরিহর রায়ের আদি নিবাস ছিল যশোহর জেলায়

৮. হরিহর রায় বর্তমানে কোথায় বাস করেন?

উত্তর: হরিহর রায় বর্তমানে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে বাস করেন।

৯. দুর্গা অপুকে চুপিচুপি কী নিয়ে আসতে বলেছিল?

উত্তর: দুর্গা অপুকে চুপিচুপি তেল ও নুন নিয়ে আসতে বলেছিল।

১০. অপুর টিনের বাক্সে মোট কয়টি কড়ি ছিল?

উত্তর: অপুর টিনের বাক্সে মোট ২৬টি কড়ি ছিল।

পরিবেশ ও আনুষঙ্গিক তথ্যাদি

১১. 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পে 'পটু' কে?

উত্তর: 'পটু' হলো গ্রামের একটি ছেলে এবং অপুর খেলার সাথী।

১২. সর্বজয়া কার কাছ থেকে টাকা ধার করেছিল?

উত্তর: সর্বজয়া গ্রামের রায়ের ঘরের গিন্নির কাছ থেকে টাকা ধার করেছিল।

১৩. হরিহর কার বাড়িতে কাজ করত?

উত্তর: হরিহর গ্রামের এক জমিদারের বাড়িতে গোমস্তার কাজ করত।

১৪. দুর্গা আমের কুশি কোথায় পেয়েছিল?

উত্তর: দুর্গা আমের কুশিগুলো পটলদের বাগানে ঝড়ে পড়ে থাকতে দেখে পেয়েছিল।

১৫. গল্পের শেষে অপু কী বাজাচ্ছিল?

উত্তর: গল্পের শেষে অপু আমের আঁটি দিয়ে তৈরি ভেঁপু (বাঁশি) বাজাচ্ছিল।

১৬. সর্বজয়া কিসের ডাল রান্না করছিল?

উত্তর: সর্বজয়া অড়হর ডাল রান্না করছিল।

১৭. হরিহর কত মাস বেতন পায়নি?

উত্তর: হরিহর গত ছয় মাস ধরে বেতন পায়নি।

১৮. নীলমণি রায় কে ছিলেন?

উত্তর: নীলমণি রায় ছিলেন হরিহরের একজন দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং নিস্তারিণী রায়ের স্বামী।

১৯. কুঠির মাঠ কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: কুঠির মাঠ নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের এক প্রান্তে অবস্থিত।

২০. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?

উত্তর: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৯৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন।


আম-আঁটির ভেঁপু: শীর্ষ ২০টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর (SSC Special)

​'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পটি কেবল এক শৈশবের গল্প নয়, এটি দারিদ্র্য ও প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্কের এক আখ্যান। পরীক্ষায় সচরাচর আসা ২০টি অনুধাবনমূলক প্রশ্নের ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:


চরিত্র ও মানসিকতা বিশ্লেষণ

১. "দুর্গার মুখে হাসি দেখা দিল"—কেন?

উত্তর: অপু যখন দিদি দুর্গার কথামতো চুপিচুপি ঘর থেকে তেল ও নুন চুরি করে আনতে সক্ষম হয়, তখন তাদের কাঁচা আম মাখা খাওয়ার পথ সুগম হয়। অপুর এই চৌর্যবৃত্তি ও সফলতায় দুর্গা আনন্দিত হয়ে হাসে।

২. সর্বজয়া কেন দুর্গাকে 'হারামজাদী' বলে গালি দিয়েছিল?

উত্তর: অভাবের সংসারে যখন খাবারের অভাব, তখন দুর্গা সারাদিন বনে-বাদাড়ে রোদে টো টো করে ঘুরে বেড়াত। মেয়ের এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও অবাধ্যতায় রাগান্বিত হয়ে মা সর্বজয়া তাকে এই গালি দেন।

৩. অপুর টিনের বাক্সটিকে 'সম্পত্তি' বলা হয়েছে কেন?

উত্তর: অপুর ভাঙা টিনের বাক্সে থাকা কড়ি, নাটাফল আর খাপরার কুচিগুলো সাধারণের কাছে মূল্যহীন হলেও অপুর কাছে সেগুলো ছিল অমূল্য সম্পদ। তার কল্পনা ও আনন্দের পুরো জগতটিই ছিল ওই বাক্সটিকে কেন্দ্র করে।

৪. "দুজনে চুপিচুপি আম খাইতে লাগিল"—কেন?

উত্তর: অপু ও দুর্গা জানত যে মা জানলে আম খাওয়ার জন্য বকুনি দেবে, কারণ অসময়ে কাঁচা আম খেলে অসুখ হতে পারে। তাই মায়ের বকুনির ভয়ে তারা আড়ালে লুকিয়ে আম খাচ্ছিল।

৫. হরিহর কেন বেতন চাইতে দ্বিধা করত?

উত্তর: হরিহর ছিলেন অত্যন্ত লাজুক ও সংবেদনশীল প্রকৃতির মানুষ। দারিদ্র্যের মাঝেও তিনি নিজের আত্মসম্মান বজায় রাখতে চাইতেন, তাই বকেয়া বেতন চাইতে তার লজ্জা ও কুণ্ঠা বোধ হতো।


দারিদ্র্য ও জীবন সংগ্রাম

৬. সর্বজয়ার সংসার চালানো কেন কঠিন হয়ে পড়েছিল?

উত্তর: হরিহর গত ছয় মাস ধরে বেতন পাননি। সামান্য আয়ে চারজনের ভরণপোষণ ও ঘর মেরামত করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলেই সর্বজয়ার পক্ষে সংসার চালানো কঠিন ছিল।

৭. "গল্পে দারিদ্র্যের যে ছবি ফুটেছে তা বর্ণনা করো।"

উত্তর: গল্পে ভাঙা ঘর, রোয়াকে ফাটল, খাবারের অভাব এবং সামান্য আম-আঁটির ভেঁপু বা কড়ি নিয়ে শিশুদের সন্তুষ্টির মাধ্যমে অত্যন্ত করুণ অথচ বাস্তব দারিদ্র্যের ছবি ফুটেছে।

৮. হরিহর কেন অন্য গ্রামে চলে যাওয়ার কথা ভেবেছিল?

উত্তর: নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে তার আয় ছিল যৎসামান্য। অন্যদিকে দশঘরায় তার শিষ্যরা তাকে জায়গা ও আয়ের সুব্যবস্থা করে দিতে চেয়েছিল, তাই অভাব থেকে বাঁচতে তিনি গ্রাম ছাড়ার কথা ভাবেন।

৯. "লক্ষ্মী মা আমার, কোথাও বেরুস নি"—সর্বজয়া এ কথা কেন বলেছিল?

উত্তর: রোদে ঘুরে বেড়ালে শরীর খারাপ হতে পারে এবং পাড়ার লোকে মেয়ে বড় হয়েছে বলে সমালোচনা করতে পারে—এই আশঙ্কা থেকে মা সর্বজয়া দুর্গাকে আগলে রাখতে চেয়েছিল।

১০. দুর্গা কেন অপুর কাছে ধরা পড়ার ভয় পাচ্ছিল?

উত্তর: দুর্গা যখন আম মাখা খাচ্ছিল, তখন অপু যদি জোরে শব্দ করত বা আমের রস তার মুখে লেগে থাকত, তবে মা সহজেই টের পেয়ে যেতেন। তাই সে খুব সতর্ক ছিল।


প্রকৃতি ও নস্টালজিয়া

১১. 'আম-আঁটির ভেঁপু' নামকরণের সার্থকতা কী?

উত্তর: গল্পের শেষে আমের শুকনো আঁটি দিয়ে তৈরি বাঁশি বা ভেঁপু বাজানোর মাধ্যমেই অপুর শৈশব ও তার আনন্দের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তুচ্ছ জিনিসের মাঝে গভীর আনন্দ খুঁজে পাওয়াই এই নামকরণের মূল ভিত্তি।

১২. "বনের ফল কুড়ানোই দুর্গার নেশা"—বুঝিয়ে বলো।

উত্তর: দুর্গা প্রকৃতিপ্রেমী ও চঞ্চল। ঘরের অভাব তাকে স্পর্শ করতে পারে না, বরং প্রকৃতির মাঝে থাকা বিভিন্ন ফলমূল কুড়ানোই ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দ ও ব্যস্ততা।

১৩. অপুর কল্পনার জগৎ কেমন ছিল?

উত্তর: অপুর কল্পনার জগৎ ছিল তার খেলনার বাক্সের মতো রঙিন। সামান্য নাটাফলকে সে চাকা মনে করত এবং কড়িগুলোকে সে তার বিশাল সম্পদ বলে জ্ঞান করত।

১৪. গ্রামের মানুষের প্রতি হরিহরের মনোভাব কেমন ছিল?

উত্তর: হরিহর গ্রামের মানুষের ওপর খুব একটা খুশি ছিলেন না। তিনি মনে করতেন গ্রামের মানুষ তাকে যথাযথ সম্মান ও সাহায্য দেয় না, তাই তিনি আক্ষেপ করতেন।

১৫. "মানুষের শৈশব স্মৃতি কেন মধুর হয়?"

উত্তর: শৈশবে কোনো জটিলতা থাকে না, সামান্য জিনিসেই মানুষ খুশি হতে পারে। অপুর ভেঁপু বাজানো বা দুর্গার আম কুড়ানোর স্মৃতিগুলো তাই সবার কাছে অত্যন্ত নস্টালজিক ও মধুর।


উপসংহার ও পাঠ মূল্যায়ন

১৬. সর্বজয়া চরিত্রটি কেন সংঘাতময়?

উত্তর: সর্বজয়া একদিকে সন্তানদের ভালোবাসেন, অন্যদিকে অভাবের তাড়নায় খিটখিটে মেজাজের হয়ে যান। মাতৃত্ব ও দারিদ্র্যের এই সংঘাতই তার চরিত্রকে বাস্তবধর্মী করেছে।

১৭. "বাঁশের বাগান ও দুপুরবেলা"—গল্পে এর গুরুত্ব কী?

উত্তর: এই আবহটি গ্রামীণ নির্জনতা ও রহস্যময়তা তৈরি করে। অপু-দুর্গার গোপন অভিযানের জন্য দুপুরবেলা ও বাঁশঝাড়ের আড়াল ছিল উপযুক্ত স্থান।

১৮. হরিহরের আদি নিবাস ত্যাগের কারণ কী ছিল?

উত্তর: পৈতৃক ভিটায় তেমন কোনো আয় বা উন্নতির সুযোগ ছিল না বলেই হরিহর তার আদি নিবাস ত্যাগ করে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলেন।

​১৯. দুর্গার মাতৃত্বসুলভ আচরণ কীভাবে ফুটেছে?

উত্তর: দুর্গা নিজে আম কুড়িয়ে আনত, অপুকে অংশ দিত এবং মায়ের বকুনি থেকে অপুকে আড়াল করত। তার এই আচরণেই ছোট ভাইয়ের প্রতি দিদির মাতৃত্বসুলভ মমতা প্রকাশ পায়।

২০. 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পটি আমাদের কী শিক্ষা দেয়?

উত্তর: এই গল্প শিক্ষা দেয় যে, জাগতিক সম্পদের চেয়ে মানবিক সম্পর্ক ও ক্ষুদ্র জিনিসের মাঝে আনন্দ খুঁজে পাওয়া অনেক বেশি মূল্যবান। এটি জীবনের সহজ-সরল রূপের জয়গান গায়।


SSC Vocational Bangla Final Suggestion 2026 |এসএসসি ভোকেশনাল বাংলা চূড়ান্ত সাজেশন ২০২৬
এস এস সি (দশম) পরীক্ষা ২০২৬ গণিত সাজেশন- (ভকেশনাল)

আম-আঁটির ভেঁপু FAQ

'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পটি কোন উপন্যাসের অংশ?

'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পটি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কালজয়ী উপন্যাস 'পথের পাঁচালী' থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

গল্পের প্রধান চরিত্র অপু ও দুর্গার বয়সের পার্থক্য কত?

গল্পে অপু ও দুর্গার বয়সের সঠিক উল্লেখ না থাকলেও বর্ণনা অনুযায়ী দুর্গা অপুর চেয়ে ২-৩ বছরের বড় এবং অপুর বয়স আনুমানিক সাত-আট বছর।

অপুর টিনের বাক্সে কী কী খেলনা ছিল?

অপুর ভাঙা টিনের বাক্সে ছিল একটি খাপরার কুচি, গঙ্গা-যমুনার খেলার কড়ি, শুকনো নাটাফল এবং একটি আমের আঁটি দিয়ে তৈরি বাঁশি (ভেঁপু)।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন