...

মানুষ মুহম্মদ (স.) | নবম-দশম শ্রেণি। বিস্তারিত আলোচনা সৃজনশীল সহ।।


মানুষ মুহম্মদ (স.) | নবম-দশম শ্রেণি। কাহিনি ও সৃজনশীল।।




ভূমিকা: বাংলা সাহিত্য আমাদের জীবনের দর্পণ। নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে যেমন জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা ফুটে উঠেছে, তেমনি ‘নিম গাছ’ ও ‘প্রত্যুপকার’ গল্পে নিঃস্বার্থ সেবা ও কৃতজ্ঞতাবোধের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আবার ‘জীবন বিনিময়’ কবিতার আত্মত্যাগ এবং ‘একুশের গল্প’-এর অবিনাশী চেতনা আমাদের দেশপ্রেমকে জাগ্রত করে।'কপোতাক্ষ নদ' কেবল একটি কবিতায় কবির ভুল স্বীকার এবং শেকড়ে ফেরার এক করুণ আর্তনাদ ছিল। 'তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা' কবিতার মূল বিষয়বস্তু আরও গভীরে গিয়ে এবং বিস্তারিতভাবে আলোচনা করাছি। আজ এই লেকচার নোটটিতে আমরা এই কবিতার মূল বিষয়বস্তু ও পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো সহজভাবে বিশ্লেষণ করব।


লেখক পরিচিতি: মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬ - ১৯৫৪)


মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক এবং সাংবাদিক। তাঁর গদ্যশৈলী অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, যুক্তিপূর্ণ এবং সহজবোধ্য। বিশেষ করে মুসলিম ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ এবং মহানবীর (স.) জীবনদর্শন তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন।

১. জন্ম ও পরিচয়


মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ১৮৯৬ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা জেলার বাঁশদহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পিতার নাম ছিল মোহাম্মদ শাহাদত আলী।


২. শিক্ষাজীবন

তিনি বাঁশদহ হাইস্কুল থেকে এন্ট্রাস এবং পরে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে এফএ (আইএ) পাশ করেন।

পরবর্তীতে তিনি বিএ ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণে তাঁর নিয়মিত পড়াশোনা ব্যাহত হয়।

৩. কর্মজীবন ও সাংবাদিকতা

তিনি মূলত পেশায় ছিলেন একজন সাংবাদিক।

তিনি ‘দি মোসলেম’, ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’, ‘দৈনিক মোহাম্মদী’, ‘দৈনিক সেবক’, এবং ‘ইংরেজি দ্য মুসলমান’ পত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

৪. সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

তাঁর রচনায় যুক্তিবাদিতা এবং স্বচ্ছ চিন্তা প্রকাশ পায়।

তিনি কোনো অলৌকিকতার আশ্রয় না নিয়ে ইতিহাসের আলোকে বাস্তবধর্মী গদ্য লিখতে পছন্দ করতেন।

৫. উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ

  1. মরুভাস্কর: এটি তাঁর অমর সৃষ্টি (হযরত মুহম্মদ স.-এর জীবনী)।
  2. স্মার্ণানন্দিনী
  3. ছোটদের হযরত মুহম্মদ
  4. কাফেলা

৬. মৃত্যু

তিনি ১৯৫৪ সালের ৮ই নভেম্বর নিজ গ্রাম বাঁশদহে মৃত্যুবরণ করেন।

‘মানুষ মুহম্মদ (স.)’ প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তু


এই প্রবন্ধের মূল কথা হলো—হযরত মুহম্মদ (স.) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমাদের মতোই একজন রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন। লেখক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী অলৌকিক কোনো কাহিনীর চেয়ে নবীর মানবিক গুণাবলিকে এখানে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

১. মানুষের মতো মৃত্যু: 

প্রবন্ধের শুরুতেই দেখা যায়, মহানবীর (স.) মৃত্যুর সংবাদ শুনে সাহাবীরা স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলেন। অনেকে এটি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। কিন্তু হযরত আবু বকর (রা.) সবাইকে বুঝিয়ে বলেন যে, নবী মুহম্মদ (স.) একজন মানুষ ছিলেন এবং প্রতিটি মানুষকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তিনি আমাদের মতোই মরণশীল ছিলেন।

২. অসীম ধৈর্য ও ক্ষমা:


 ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তিনি তায়েফে যে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তা এই প্রবন্ধের একটি বড় অংশ। কাফেরদের পাথরের আঘাতে তাঁর শরীর রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তিনি তাদের অভিশাপ দেননি। বরং তিনি তাদের জন্য দোয়া করেছিলেন যেন আল্লাহ তাদের জ্ঞান দান করেন। শত্রুকে ক্ষমা করার এমন উদারতা কেবল তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল।

৩. সাধারণ জীবনযাপন:


 তিনি একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও আধ্যাত্মিক নেতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তিনি অনেক সময় না খেয়ে থাকতেন, খেজুর পাতায় ঘুমাতেন। তাঁর চরিত্রে কোনো অহংকার ছিল না। মানুষের সাথে তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও কোমল আচরণ করতেন।

৪. অসাম্প্রদায়িক ও ন্যায়পরায়ণ চেতনা: 

মহানবী (স.) সর্বদা ন্যায় ও সত্যের পথে ছিলেন। তিনি শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার সাথে মানবিক আচরণ করতেন। মক্কা বিজয়ের পর তিনি তাঁর চরম শত্রুদেরও মুক্তি দিয়েছিলেন, যা তাঁর মহানুভবতার পরিচয় দেয়।

৫. আদর্শ মানুষ: 

লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, তিনি যদি ফেরেশতা বা অন্য কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা হতেন, তবে আমরা সাধারণ মানুষ তাঁকে অনুসরণ করতে পারতাম না। তিনি মানুষ ছিলেন বলেই তাঁর জীবন আমাদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ বা ‘মডেল’।


‘মানুষ মুহম্মদ (স.)’ প্রবন্ধের বিস্তারিত কাহিনী ও ঘটনাবলি

১. মৃত্যুর সংবাদ ও বিশ্বাসের সংঘাত।


কাহিনীর শুরুতে আমরা দেখি এক চরম অস্থির মদিনা। মহানবীর (স.) মৃত্যুর খবর যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাহাবীদের মধ্যে এক বিশাল মানসিক বিপর্যয় নেমে আসে।

ওমরের (রা.) বীরত্বপূর্ণ শোক: 

হযরত ওমর (রা.) ছিলেন তেজস্বী বীর। তিনি প্রিয় নবীর মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছিলেন না। তাঁর মনে হয়েছিল, নবী (স.) হয়তো মুসার (আ.) মতো আল্লাহর সাথে দেখা করতে গেছেন, আবার ফিরে আসবেন। এই প্রবল আবেগ থেকে তিনি ঘোষণা করেন, যে ব্যক্তি নবীর মৃত্যুর কথা বলবে, তাকে তিনি তলোয়ার দিয়ে আঘাত করবেন।

আবু বকরের (রা.) অটল সত্য: 

এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে হযরত আবু বকর (রা.) ছিলেন ধীরস্থির (স্থিতপ্রজ্ঞ)। তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে ইসলামের মূল ভিত্তি মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন— "যাহারা মুহম্মদের পূজা করিত, তাহারা জানুক তিনি মারা গিয়াছেন; আর যাহারা আল্লাহর উপাসক, তাহারা জানুক আল্লাহ অমর।" এই একটি বাক্য এবং পবিত্র কোরআনের আয়াত সাহাবীদের শোকাতুর হৃদয়কে শান্ত করে এবং সত্যকে মেনে নেওয়ার শক্তি দেয়।

২. তায়েফে নির্যাতিত মহানবী ও তাঁর প্রার্থনা।

লেখক এখানে রাসুলের (স.) অজেয় ধৈর্যের কথা তুলে ধরেছেন। মক্কায় যখন ইসলাম প্রচার করা কঠিন হয়ে পড়ছিল, তখন তিনি তায়েফে যান। কিন্তু সেখানে তিনি যা পেয়েছিলেন তা ছিল বীভৎস।

পাথর বৃষ্টি ও রক্তপাত: 

তায়েফের বখাটে ছেলেরা তাঁকে লক্ষ্য করে অবিরাম পাথর ছুঁড়তে থাকে। পাথরের আঘাতে তাঁর শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়। তাঁর জুতা রক্তে ভিজে পায়ের চামড়ার সাথে লেগে গিয়েছিল। শরীর থেকে এতটাই রক্ত ঝরেছিল যে তিনি কয়েকবার জ্ঞান হারান।

ক্ষমার মহিমা: 

জ্ঞান ফিরলে তিনি ফেরেশতাদের সহায়তায় তাদের ধ্বংস করতে পারতেন। কিন্তু নবী (স.) বলেছিলেন— "ললাটের রক্ত মুছিতে মুছিতে তিনি বলিলেন, ‘হে প্রভু, ইহাদের জ্ঞান দাও, ইহারা অবুঝ।’" তিনি তাদের অনাগত সন্তানদের কল্যাণের জন্য দোয়া করেছিলেন। এটিই ছিল তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব।

৩. সাধারণ জীবনযাপন ও বিনয়।


তিনি যখন আরবের অবিসংবাদিত নেতা, তখনও তাঁর জীবন ছিল কোনো সাধারণ দিনমজুরের মতো।

দারিদ্র্য ও তুষ্টি: 

তাঁর ঘরে মাসের পর মাস চুলা জ্বলত না। শুকনো খেজুর আর জল খেয়ে তিনি দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতেন। খেজুর পাতার চাটাই ছিল তাঁর বিছানা, যা তাঁর শরীরে দাগ ফেলে দিত।

ভয় নয়, ভালোবাসা: 

একবার এক ব্যক্তি মহানবীর (স.) সামনে কথা বলতে এসে ভয়ে কাঁপতে থাকে। তখন নবী (স.) তাকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন যে, তিনি কোনো রাজা-বাদশাহ নন, বরং তিনি সেই কুরাইশ বংশের এক সাধারণ নারীর সন্তান, যে শুকনো মাংস খেয়ে জীবন কাটাত। এই ঘটনার মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন তিনি কতটা নিরহংকার ছিলেন।

৪. মক্কা বিজয় ও চরম শত্রুর মুক্তি।

যে কুরাইশরা তাঁকে ১৩ বছর নির্যাতন করেছে, বয়কট করেছে এবং দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে, মক্কা বিজয়ের দিন তারা ছিল তাঁর হাতের মুঠোয়।

প্রতিশোধের বদলে ক্ষমা:

 তিনি চাইলে সেদিন সবাইকে শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সবাইকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন— "তোমরা আজ আমার কাছে কেমন আচরণ আশা করো?" তারা যখন করুণা চাইল, তখন তিনি বললেন— "তোমাদের বিরুদ্ধে আজ আমার কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা সবাই মুক্ত।" যুদ্ধের ইতিহাসে এটি ছিল এক অভূতপূর্ব ক্ষমা।

৫. অসাম্প্রদায়িক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি।


মহানবী (স.) কেবল মুসলমানদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবতার জন্য রহমত ছিলেন। তিনি অন্য ধর্মের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

বিবেচ্য বিষয়: 

তাঁর এই উদারতা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার ফলেই তিনি ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ হতে পেরেছিলেন। লেখকের মতে, তাঁর এই গুণটি বর্তমান বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

৬. অলৌকিকতার চেয়ে যুক্তির প্রাধান্য।


মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী এই প্রবন্ধে একটি সাহসী কাজ করেছেন—তিনি কোনো প্রকার অলৌকিক কাহিনীর (Miracle) ওপর নির্ভর না করে বাস্তবসম্মত ও যুক্তিপূর্ণ জীবনচিত্র এঁকেছেন।


ব্যাখ্যা: তিনি দেখিয়েছেন যে, পাথর ছুঁড়লে রক্ত ঝরা বা রোদে হাঁটলে কষ্ট হওয়া—এসবই মানবিক সত্য। এই পয়েন্টটি আপনার পাঠকদের বোঝাতে সাহায্য করবে যে, নবীজি কেন আমাদের জন্য একজন অনুকরণীয় ‘হিউম্যান আইকন’।

৭. সত্যের পথে অবিচলতা (দৃঢ় সঙ্কল্প)।

বিপদের মুখে বা প্রলোভনের সামনে তিনি কেমন ছিলেন?


ঘটনা: কুরাইশরা যখন তাঁকে ধর্মের পথ থেকে ফেরাতে পাহাড় সমান ঐশ্বর্য এবং ক্ষমতার লোভ দেখিয়েছিল, তিনি তখন একবাক্যে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর এই চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রবন্ধের একটি শক্তিশালী দিক।

৮. পশুপাখি ও প্রকৃতির প্রতি মমতা।

মানুষের পাশাপাশি তিনি পশুপাখির প্রতিও যে সহানুভূতিশীল ছিলেন, তার ছিটেফোঁটা আভাস এই প্রবন্ধে আছে।

মূলকথা: তিনি জীবজগতকেও ভালোবাসতেন। তাঁর হৃদয়ে কেবল মানুষের জন্য নয়, সৃষ্টিজগতের সবকিছুর জন্যই জায়গা ছিল।

৯. নারীর প্রতি সম্মান ও মর্যাদা।


তৎকালীন অন্ধকার যুগে নারীদের যখন কোনো সম্মান ছিল না, তিনি তখন নারীদের অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন।


পয়েন্ট: তাঁর নিজের জীবনে বিবি খাদিজা (রা.)-এর অবদান এবং তাঁর প্রতি নবীর আজীবন কৃতজ্ঞতাবোধ—এটিও মানবিক শ্রেষ্ঠত্বের একটি বড় প্রমাণ।

মানুষ মুহম্মদ (স.)’ প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও টীকা।


১. মরু-ভাস্কর: মরুভূমির সূর্য। এখানে হযরত মুহম্মদ (স.)-কে বোঝানো হয়েছে, যিনি অন্ধকার আরবে আলোর দিশারি হয়ে এসেছিলেন।


২. স্থিতপ্রজ্ঞ: যার বুদ্ধি স্থির। বিপদে বা শোকে যিনি বিচলিত হন না। প্রবন্ধে হযরত আবু বকর (রা.)-কে এই বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে।


৩. কাফেলা: যাত্রীবাহী দল বা বিচরণশীল যাত্রীদল। সাধারণত মরুভূমিতে উটের পিঠে চড়ে যারা ভ্রমণ করে।


৪. মুস্তফা: মনোনীত। এটি মহানবী (স.)-এর একটি অন্যতম পবিত্র উপাধি।


৫. পরহিতব্রত: অন্যের মঙ্গলের জন্য কাজ করা। যাঁর জীবনের ব্রত বা লক্ষ্যই হলো অন্যের কল্যাণ করা।


৬. রাহমাতুল্লিল আলামিন: জগৎসমূহের জন্য আশীর্বাদ। মহানবী (স.)-কে আল্লাহ তায়ালা সারা বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন।


৭. বদর: মক্কার কুরাইশ ও মদিনার মুসলমানদের মধ্যে সংঘটিত ইসলামের ইতিহাসের প্রথম প্রধান যুদ্ধ।


৮. ওহুদ: মদিনার নিকটবর্তী একটি পাহাড়। এখানে মুসলমানদের সাথে কুরাইশদের দ্বিতীয় যুদ্ধ হয়েছিল।


৯. হিজরত: পরিত্যাগ করা বা দেশত্যাগ। মহানবী (স.) মক্কা থেকে মদিনায় গমন করাকে হিজরত বলা হয়।


১০. বৈরাগ্য: জগত বা সংসার বিমুখতা। পার্থিব মায়া-মমতা ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হওয়া।


১১. অনুকম্পা: দয়া বা করুণা। অন্যের দুঃখ দেখে বিচলিত হওয়া ও সাহায্যের হাত বাড়ানো।


১২. ত্রাস: ভয় বা আতঙ্ক। যা মানুষের মনে ভয়ের সৃষ্টি করে।


১৩. অকুতোভয়: যার কোনো ভয় নেই। নির্ভীক বা অত্যন্ত সাহসী ব্যক্তি।


১৪. ললাট: কপাল। প্রবন্ধে তায়েফে নবীর রক্তাক্ত ললাটের কথা উল্লেখ আছে।


১৫. নিস্পৃহ: কোনো কিছুর প্রতি আকাঙ্ক্ষা বা লোভ না থাকা। নির্লোভ মানসিকতা।


‘মানুষ মুহম্মদ (স.)’ প্রবন্ধের ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানমূলক প্রশ্নোত্তর।


১. ‘মানুষ মুহম্মদ (স.)’ প্রবন্ধটি কোন গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে? 
উত্তর: মরু-ভাস্কর।


২. ‘মানুষ মুহম্মদ (স.)’ প্রবন্ধের লেখকের নাম কী?
 উত্তর: মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী।


৩. লেখক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর জন্ম কত সালে? 
উত্তর: ১৮৯৬ সালে।


৪. মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর জন্মস্থান কোথায়? 
উত্তর: সাতক্ষীরা জেলার বাঁশদহ গ্রামে।


৫. মহানবী (স.)-এর মৃত্যুর সংবাদ শুনে কে তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়েছিলেন?
 উত্তর: হযরত ওমর (রা.)।


৬. কার ভাষণে সাহাবীদের শোকাতুর মনে শান্তি ফিরে এসেছিল? 
উত্তর: হযরত আবু বকর (রা.)।


৭. ‘স্থিতপ্রজ্ঞ’ শব্দের অর্থ কী? 
উত্তর: স্থিরবুদ্ধি সম্পন্ন বা ধীরস্থির।


৮. তায়েফ শহরটি মক্কা থেকে কত দূরে অবস্থিত? 
উত্তর: প্রায় ৭০ মাইল।


৯. তায়েফে পাথর ছুড়ে মহানবী (স.)-কে কারা রক্তাক্ত করেছিল? 
উত্তর: তায়েফের পৌত্তলিকরা বা বখাটেরা।


১০. কে মহানবী (স.)-কে ‘দুগ্ধপোষ্য শিশু’র মতো আগলে রাখতেন? 
উত্তর: বিবি খাদিজা (রা.)।


১১. মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (স.) শত্রুদের প্রতি কী ঘোষণা করেছিলেন? 
উত্তর: সাধারণ ক্ষমা।


১২. কার চরিত্রে কটু কথা বা বিরক্তির কোনো চিহ্ন ছিল না? 
উত্তর: মহানবী হযরত মুহম্মদ (স.)-এর।


১৩. মহানবী (স.) কোন বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন? 
উত্তর: কুরাইশ বংশে।


১৪. হযরত আবু বকর (রা.) কোন সূরার আয়াত পাঠ করেছিলেন? 
উত্তর: সূরা আল-ইমরানের ১৪৪ নম্বর আয়াত।


১৫. নবীজির পিঠে কিসের দাগ পড়ে যেত? 
উত্তর: খেজুর পাতার চাটাইয়ের।


১৬. ‘মুস্তফা’ শব্দের অর্থ কী? 
উত্তর: মনোনীত।


১৭. ‘মরু-ভাস্কর’ শব্দের অর্থ কী? 
উত্তর: মরুভূমির সূর্য।


১৮. লেখক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী কোন পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন? 
উত্তর: সাংবাদিকতা।


১৯. মহানবী (স.)-এর মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স কত হয়েছিল? 
উত্তর: ৬৩ বছর।


২০. কাকে দেখে এক ব্যক্তি ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছিল? 
উত্তর: মহানবী হযরত মুহম্মদ (স.)-কে।


২১. ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ শব্দের অর্থ কী? 
উত্তর: সারা বিশ্বের জন্য রহমত বা আশীর্বাদ।


২২. মানুষের মনকে কিসের মাধ্যমে জয় করেছিলেন নবীজি? 
উত্তর: ভালোবাসা ও মমতা দিয়ে।


২৩. মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী কোন পত্রিকায় কাজ করতেন? 
উত্তর: মাসিক মোহাম্মদী (এছাড়া দৈনিক সেবক, ইংরেজি দ্য মুসলমান ইত্যাদি)।


২৪. ‘পরহিতব্রত’ শব্দের অর্থ কী? 
উত্তর: অন্যের মঙ্গলে নিবেদিত প্রাণ।


২৫. মহানবী (স.)-এর কন্যার নাম কী ছিল? 
উত্তর: হযরত ফাতেমা (রা.)।


২৬. শোকাতুর মানুষের উদ্দেশ্যে আবু বকর (রা.) কী বলেছিলেন?
 উত্তর: “যাহারা মুহম্মদের পূজা করিত, তাহারা জানুক তিনি মারা গিয়াছেন।”


২৭. মক্কা থেকে মদীনায় চলে যাওয়াকে কী বলা হয়? 
উত্তর: হিজরত।


২৮. নবীজির চরিত্রে কিসের সমন্বয় ঘটেছিল? 
উত্তর: কোমলতা ও কঠোরতার।


২৯. মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী কত সালে মৃত্যুবরণ করেন? 
উত্তর: ১৯৫৪ সালে।


৩০. ‘মানুষ মুহম্মদ (স.)’ প্রবন্ধের মূল সুর কী? 
উত্তর: মহানবীর মানবিক গুণাবলি।


‘মানুষ মুহম্মদ (স.)’ প্রবন্ধের ১৫টি অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর

১. হযরত ওমর (রা.) কেন কোষমুক্ত তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়েছিলেন? 


উত্তর: মহানবী (স.)-এর মৃত্যুসংবাদ শুনে শোকাতুর ও বিচলিত হয়ে হযরত ওমর (রা.) তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রিয় নবীর প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে তিনি তাঁর মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছিলেন না, তাই কেউ তাঁকে মৃত বললে তাকে হত্যার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

২. “যিনি মুহম্মদের উপাসনা করিতেন, তিনি মরিতে পারেন”—বলতে কী বোঝানো হয়েছে? 

উত্তর: এই বাক্যের মাধ্যমে হযরত আবু বকর (রা.) মহানবী (স.)-এর মরণশীলতা ও মানবিক পরিচয়কে তুলে ধরেছেন। তিনি সাহাবীদের বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, মুহম্মদ (স.) একজন মানুষ ছিলেন এবং আল্লাহর বিধান অনুযায়ী প্রতিটি মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়।

৩. “হে প্রভু, এদের জ্ঞান দাও, এরা অবুঝ”—বলতে কী বোঝানো হয়েছে? 

উত্তর: এই উক্তির মাধ্যমে মহানবী (স.)-এর ক্ষমাশীলতা ও শত্রুর প্রতি মহানুভবতা প্রকাশ পেয়েছে। তায়েফে কাফেরদের পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়েও তিনি তাদের ধ্বংস চাননি, বরং তাদের হেদায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন।

৪. ‘মানুষ মুহম্মদ (স.)’ প্রবন্ধে মহানবীকে ‘স্থিতপ্রজ্ঞ’ বলা হয়েছে কেন? 

উত্তর: চরম শোকের মুহূর্তেও ধীরস্থির ও অটল থাকতে পারার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য তাঁকে ‘স্থিতপ্রজ্ঞ’ বলা হয়েছে। নবীজির মৃত্যুর পর যখন সবাই দিশেহারা, তখন হযরত আবু বকর (রা.) অসীম ধৈর্য নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন বলেই তিনি এই বিশেষণে ভূষিত।

৫. মহানবী (স.) কেন নিজেকে ‘শুকনো মাংস খোর’ নারীর সন্তান বলেছিলেন? 

উত্তর: আগন্তুক এক ব্যক্তির ভয় দূর করতে এবং নিজের নিরহংকার পরিচয় দিতে তিনি কথাটি বলেছিলেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, তিনি কোনো প্রতাপশালী রাজা নন, বরং অতি সাধারণ এক মায়ের সন্তান এবং সবার মতোই একজন সাধারণ মানুষ।

৬. ‘মানুষ মুহম্মদ (স.)’ প্রবন্ধে বীরবাহু ওমর (রা.) কেন স্তব্ধ হয়েছিলেন? 

উত্তর: হযরত আবু বকর (রা.)-এর মুখে কোরআনের আয়াত ও ধ্রুব সত্য শুনে হযরত ওমর (রা.) স্তব্ধ হয়েছিলেন। আল্লাহর বাণী শোনার পর তাঁর শোকাতুর মনের ঘোর কাটে এবং তিনি বুঝতে পারেন যে প্রিয় নবীর মৃত্যু একটি অনিবার্য বাস্তবতা।

৭. মহানবী (স.) কেন তায়েফবাসীকে অভিশাপ দেননি? 

উত্তর: মহানবী (স.) ছিলেন রহমাতুল্লিল আলামিন বা বিশ্ববাসীর জন্য আশীর্বাদ, তাই তিনি কাউকে অভিশাপ দেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন আজ যারা তাঁকে আঘাত করছে, কাল তাদের বংশধরেরাই ইসলামের সত্য আলোতে ফিরে আসবে।

৮. “আমি রাজা নহি, সম্রাট নহি”—বলতে লেখক কী বুঝিয়েছেন? 

উত্তর: এর মাধ্যমে মহানবী (স.)-এর বিনয় এবং আড়ম্বরহীন সাধারণ জীবনযাপনের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আরবের অবিসংবাদিত নেতা হয়েও তিনি ক্ষমতার দাপট দেখাতেন না, বরং সাধারণ মানুষের সাথে মিশে থাকতেন।

৯. বিবি খাদিজা (রা.) কীভাবে মহানবী (স.)-কে সাহস জুগিয়েছিলেন? 

উত্তর: ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক কঠিন সময়ে বিবি খাদিজা (রা.) সম্পদ ও মমতা দিয়ে নবীজিকে আগলে রেখেছিলেন। তিনি তাঁর স্বামীর সত্যনিষ্ঠার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন এবং সব বিপদে পরম বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়িয়ে সাহস দিয়েছিলেন।

১০. মহানবী (স.)-এর চরিত্রে কোমলতা ও কঠোরতার সংমিশ্রণ ঘটেছিল কেন? 

উত্তর: সত্যের পথে তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল (কঠোর), আর মানুষের জন্য তাঁর হৃদয় ছিল কুসুমের মতো কোমল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি যেমন কঠোর অবস্থান নিতেন, সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টে তেমনই তিনি ব্যথিত ও দয়াবান হতেন।

১১. “তাঁহার মহাপ্রয়াণে মদিনায় যেন অন্ধকার ঘনাইয়া আসিল”—ব্যাখ্যা করো। 

উত্তর: মহানবী (স.)-এর মৃত্যুতে সাহাবীদের মনে যে গভীর শোক ও দিশেহারা ভাব তৈরি হয়েছিল, তাকেই অন্ধকার বলা হয়েছে। তিনি ছিলেন সাহাবীদের পরম আশ্রয় ও আলোকবর্তিকা, তাই তাঁর অনুপস্থিতিতে মদিনাবাসী নিজেদের অভিভাবকহীন মনে করতে থাকে।

১২. মক্কা বিজয়ের দিন মহানবীর মহানুভবতা কেমন ছিল? 

উত্তর: মক্কা বিজয়ের দিন তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের শত্রুদের কোনো প্রতিশোধ না নিয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। যে কুরাইশরা তাঁকে নির্যাতন করেছিল, তিনি তাদের প্রতি কোনো কটু কথা না বলে ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়েন।

১৩. ‘মরু-ভাস্কর’ বলতে লেখক কী বুঝিয়েছেন? 

উত্তর: ‘মরু-ভাস্কর’ বলতে লেখক মরুভূমির সূর্য অর্থাৎ অন্ধকার আরবে আলোর দিশারি হযরত মুহম্মদ (স.)-কে বুঝিয়েছেন। তৎকালীন অন্ধকারাচ্ছন্ন ও কুসংস্কারে ভরা আরবে তিনি ইসলামের আলো ছড়িয়ে সমাজকে আলোকিত করেছিলেন।

১৪. মহানবীর মানবিক গুণাবলি কেন আমাদের জন্য অনুসরণীয়? 

উত্তর: তিনি মানুষ ছিলেন বলেই তাঁর দেখানো পথ ও গুণাবলি অনুসরণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব। তিনি যদি ফেরেশতা হতেন তবে আমরা সাধারণ মানুষ তাঁকে আদর্শ হিসেবে নিতে পারতাম না, তাঁর মানবিক জীবনই আমাদের বড় শিক্ষা।

১৫. “সত্যের নিবিড় সাধনায় তাঁহার চরিত্র মধুময় হইয়া উঠিয়াছিল”—বলতে কী বোঝায়? 

উত্তর: আজীবন সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকায় মহানবীর চরিত্রে এক অপার্থিব সৌন্দর্য ও কোমলতা তৈরি হয়েছিল। সব ধরনের লোভ-লালসা ও মোহের ঊর্ধ্বে থেকে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করায় তাঁর ব্যক্তিত্ব সবার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।


আরো দেখুন-----

তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ কবিতার বিস্তারিত লেকচার শিট (মূলভাব, ব্যাখ্যা ও প্রশ্নোত্তর)।

তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ কবিতার মূলভাব, ব্যাখ্যা ও প্রশ্নোত্তর। ভূমিকা: বাংলা সাহিত্য আমাদের জীবনের দর্পণ। নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে যেমন জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা ফুটে উঠেছে, তেমনি ‘ নিম গাছ ’ ও ‘ প্রত্…

কপোতাক্ষ নদ কবিতার ব্যাখ্যা ও সৃজনশীল গাইড - ৯ম-১০ম শ্রেণি।

কপোতাক্ষ নদ: কবি পরিচয়, প্রেক্ষাপট ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা। ভূমিকা: বাংলা সাহিত্য আমাদের জীবনের দর্পণ। নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে যেমন জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা ফুটে উঠেছে, তেমনি ‘ নিম গাছ ’ ও ‘ প্রত্যুপকার ’ গল্পে নিঃস…

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন