...

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ০– ১২০৪ খ্রি.।। চাকরি ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি।।

 

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস (খ্রিস্টপূর্বাব্দ – ১২০৪ খ্রি.)

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস (খ্রিস্টপূর্বাব্দ – ১২০৪ খ্রি.)

বাংলার প্রাচীন ইতিহাস একক সাম্রাজ্যভিত্তিক ছিল না; বরং বিভিন্ন রাজ্য ও রাজবংশের শাসনে বিভক্ত ছিল। প্রাচীন বাংলার ভূখণ্ড মূলত তিনটি ঐতিহাসিক অঞ্চলে বিভক্ত ছিল —
বঙ্গ, অঙ্গ, এবং পুণ্ড্র।

প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক বিকাশ।

খ্রিস্টপূর্ব ১২০০: 

অথর্ববেদে প্রথমবারের মতো বঙ্গ, অঙ্গ ও মগধ রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।
এটি বাংলার রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রাচীনতম লিখিত প্রমাণ।

খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতক: 

  • বাংলা মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে আসে।
  • সম্রাট অশোকের সময় পুণ্ড্রবর্ধন (মহাস্থানগড়) ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র।

খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতক

  • শুঙ্গ ও কান্ব বংশের প্রভাব বাংলায় বিস্তার লাভ করে।

খ্রিস্টীয় ১ম শতক: 

  • বাংলার দক্ষিণাংশে সাতবাহন ও কুষাণদের প্রভাব দেখা যায়।

খ্রিস্টীয় ৪র্থ শতক:
  • গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে আসে বাংলা — যা ভারতের ‘স্বর্ণযুগ’ নামে পরিচিত।
  • এই সময়ে সাহিত্য, শিল্প ও শিক্ষার ব্যাপক বিকাশ ঘটে।

৬০৬ – ৬৩৭ খ্রি.: 

​এই সময়কালটি ছিল মূলত রাজা শশাঙ্কের উত্থান এবং তাঁর মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধনের দ্বারা বাংলা দখল।

 রাজা শশাঙ্ক: প্রাচীন বাংলার প্রথম সার্বভৌম শাসক

১. শশাঙ্ক: বাংলার প্রথম সার্বভৌম রাজা (পরিচয়, ক্ষমতা ও সময়কাল)

  • পরিচয়: রাজা শশাঙ্ক ছিলেন প্রাচীন বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম শাসক। তাঁর পূর্বে বাংলা বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদ ও বিদেশি শক্তির অধীনে ছিল। তিনিই প্রথম সমগ্র বাংলা অঞ্চলে একটি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

  • ক্ষমতা লাভের প্রেক্ষাপট: ধারণা করা হয়, শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত সাম্রাজ্যের শেষ দিকের কোনো মহাসামন্ত বা আঞ্চলিক শাসক। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর ভারতে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল, তখন তিনি সামরিক শক্তি ও কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন এবং স্বাধীন গৌড় রাজ্যের পত্তন করেন।

  • সময়কাল: তাঁর শাসনের সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে ৭ম শতাব্দীর প্রথম ভাগ (৫৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬২৫ খ্রিস্টাব্দ)।

​২. গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা, রাজধানী ও বিস্তার।

  • গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা: শশাঙ্ক তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজ্যের নাম দেন গৌড় রাজ্য। তিনিই প্রথম গৌড় নামে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক সত্তা তৈরি করেন।

  • রাজধানী: তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ। এটি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার রাজবাড়ীডাঙ্গা (মতান্তরে রাঙামাটি) অঞ্চলে অবস্থিত ছিল।

  • বিস্তার: শশাঙ্কের রাজত্ব সমগ্র বাংলা (বঙ্গ, রাঢ়, পুণ্ড্র) ছাড়িয়ে পশ্চিমে বিহারের কিছু অংশ এবং উড়িষ্যা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর ফলে গৌড় রাজ্য উত্তর ভারতের একটি অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।

৩. ধর্মীয় প্রেক্ষাপট: ধর্মমত ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তাঁর কথিত ভূমিকা।

  • ধর্মমত: শশাঙ্ক ছিলেন গোঁড়া শৈব (শিবের উপাসক)। তাঁর মুদ্রায় শিব ও বৃষের মূর্তি পাওয়া যায়।

  • বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি কথিত ভূমিকা: বৌদ্ধ সূত্র, বিশেষ করে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের বিবরণীতে শশাঙ্ককে বৌদ্ধ বিদ্বেষী হিসেবে দেখানো হয়েছে। অভিযোগ আছে যে তিনি বিহার ও স্তূপ ধ্বংস করেন এবং বোধিবৃক্ষ (যে গাছের নিচে বুদ্ধ জ্ঞান লাভ করেছিলেন) কেটে ফেলার চেষ্টা করেন। তবে এই অভিযোগগুলি কতটা সত্য, তা নিয়ে আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। তাঁর শাসনকালে কিছু বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানও বাংলায় টিকে ছিল।

​৪. অন্যান্য শক্তির সাথে সংঘাত।

  • মগধের যুদ্ধ: শশাঙ্ক প্রতিবেশী মগধের গুপ্ত রাজবংশকে পরাজিত করে মগধ দখল করেন।

  • হর্ষবর্ধনের সাথে সংঘাত: শশাঙ্কের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন উত্তর ভারতের অন্যতম শক্তিশালী শাসক হর্ষবর্ধন (থানেসরের রাজা)। শশাঙ্ক হর্ষবর্ধনের ভগ্নিপতি গ্রহবর্মণকে হত্যা করে কনৌজ দখল করেন। এরপর হর্ষবর্ধন তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল সংগ্রাম চালান।

  • কামরূপের ভাস্করবর্মণের সাথে সম্পর্ক: কামরূপের (আসাম) রাজা ভাস্করবর্মণ ছিলেন হর্ষবর্ধনের মিত্র। শশাঙ্কের বিরুদ্ধে তাঁরা যৌথভাবে জোট গঠন করেন। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধন ও ভাস্করবর্মণ গৌড় রাজ্যের কিছু অংশ দখল করে নেন।

৫. শশাঙ্কের শাসনের গুরুত্ব: বাংলায় আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ও প্রভাব।

​শশাঙ্কের শাসনকাল বাংলার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে:

  • সার্বভৌম সত্তার প্রতিষ্ঠা: শশাঙ্কই প্রথম বাংলাকে একটি শক্তিশালী, একক ও স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে উত্তর ভারতে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর হাত ধরেই বাঙালিরা প্রথম স্বাধীন রাজ্যের স্বাদ পায়।

  • ভবিষ্যৎ রাজবংশের ভিত্তি: তাঁর প্রতিষ্ঠিত গৌড় রাজ্য পরবর্তীকালের পাল ও সেন রাজবংশগুলির জন্য আঞ্চলিক শক্তি ও রাজ্যের ধারণাকে মজবুত করে।

  • বাণিজ্যের প্রসার: তাঁর আমলে বাণিজ্য ও অর্থনীতির বিকাশ ঘটেছিল বলে মনে করা হয়।

  • 'বাঙালী' পরিচয়ের সূচনা: ঐতিহাসিকদের মতে, শশাঙ্কের রাজত্বের মাধ্যমেই এই অঞ্চলে রাজনৈতিকভাবে বাঙালি পরিচয়ের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

৭৫০ খ্রি.:

নিচে আপনার চাওয়া অনুযায়ী মাৎস্যন্যায় ও পাল-সেন যুগের সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিস্তারিত আলোচনা দেওয়া হলো।

​ মাৎস্যন্যায় ও পাল-সেন যুগের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

​১. মাৎস্যন্যায়: অরাজকতার যুগ

  • মাৎস্যন্যায় কী? 'মাৎস্যন্যায়' বলতে বোঝায় এক ধরনের অরাজক পরিস্থিতি যেখানে সমাজের দুর্বলরা সবলদের দ্বারা শোষিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ঠিক যেমন বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে ফেলে।

  • সময়কাল: রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর (আনুমানিক ৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) থেকে গোপালের ক্ষমতা লাভ (৭৫০ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত প্রায় এক শতাব্দী বা তার কিছু বেশি সময় বাংলাজুড়ে এই অরাজক অবস্থা বিরাজ করছিল।

  • প্রেক্ষাপট: শশাঙ্কের মৃত্যুর পর তাঁর গৌড় সাম্রাজ্য ভেঙে যায়। বাংলার কোনো কেন্দ্রীয় শক্তি না থাকায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামন্ত রাজারা নিজেদের মধ্যে ক্ষমতা দখলের লড়াই শুরু করে। এই হানাহানি ও বিশৃঙ্খলার ফলে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। কৃষকরা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন স্থানীয় শক্তির হাতে অত্যাচারিত হতে থাকে। এই দীর্ঘকালীন অরাজকতাই ইতিহাসে 'মাৎস্যন্যায়' নামে পরিচিত।

​২. পাল সাম্রাজ্য: শান্তি ও সমৃদ্ধির যুগ (আনুমানিক ৭৫০ - ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ)

  • প্রতিষ্ঠা: ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার প্রজা বা সামন্ত প্রধানরা গোপালকে রাজা নির্বাচিত করেন। এই নির্বাচন বাংলার ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ঘটনা, কারণ এর মাধ্যমে মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটে এবং পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়।
  • গুরুত্বপূর্ণ শাসক:
    • গোপাল (৭৫০ - ৭৭৪ খ্রি.): পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বাংলায় শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।

    • ধর্মপাল (৭৭৫ - ৮১০ খ্রি.): পাল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ শাসক। তিনি পাল সাম্রাজ্যকে উত্তর ভারতের প্রধান শক্তিতে পরিণত করেন। তিনি বিখ্যাত বিক্রমশীলা মহাবিহারসোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর) প্রতিষ্ঠা করেন।

    • দেবপাল (৮১০ - ৮৫০ খ্রি.): তাঁর সময় পাল সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে।

  • ধর্ম ও সংস্কৃতি: পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের সময়ে মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম পূর্ব ভারতে বিশাল বিস্তার লাভ করে। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্পকলা (যেমন: পাল যুগের চিত্র ও ব্রোঞ্জের মূর্তি) এবং শিক্ষায় অভূতপূর্ব উন্নতি হয়।

৩. সেন সাম্রাজ্য: ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনরুত্থান (আনুমানিক ১০৭০ - ১২৩০ খ্রিস্টাব্দ)

  • উত্থান: পাল সাম্রাজ্যের পতনের মুখে সামন্ত সেন একাদশ শতাব্দীর শেষভাগে রাঢ় অঞ্চলে সেন বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। পরে বিজয় সেনের হাতে সমগ্র বাংলা থেকে পালদের প্রভাব দূর হয়।

  • মূল: সেন রাজারা ছিলেন মূলত দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আগত।

  • গুরুত্বপূর্ণ শাসক:
    • বিজয় সেন (১০৯৭ - ১১৬০ খ্রি.): সেন সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। তিনি পালদের পরাজিত করে সমগ্র বাংলা অধিকার করেন।

    • বল্লাল সেন (১১৬০ - ১১৭৮ খ্রি.): তিনি কুলীন প্রথার প্রবর্তন করেন এবং 'দানসাগর''অদ্ভুতসাগর' নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন।

    • লক্ষ্মণ সেন (১১৭৮ - ১২০৬ খ্রি.): সেন বংশের শেষ শক্তিশালী রাজা। তাঁর রাজত্বকালেই বখতিয়ার খলজি নদীয়া আক্রমণ করেন (১২০২-১২০৩ খ্রি.), যার ফলে বাংলায় সেন শাসনের অবসান শুরু হয়।

  • ধর্ম ও সংস্কৃতি: সেন রাজারা ছিলেন ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও হিন্দু ধর্মের (বিশেষ করে শৈব ও বৈষ্ণব) পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের সময়ে সংস্কৃত সাহিত্য, স্মৃতিশাস্ত্র ও কাব্যচর্চার বিশেষ বিকাশ ঘটে। কবি জয়দেব তাঁর বিখ্যাত 'গীতগোবিন্দম্' কাব্যটি লক্ষ্মণ সেনের সভাতেই রচনা করেছিলেন।

 এক নজরে পাল বংশ।

  • গোপাল  গণভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রথম রাজা বলে উল্লেখ আছে।
  • পাল শাসন প্রায় ৪০০ বছর স্থায়ী হয়।
  •  ধর্মপাল, দেবপাল ও মহীপাল ছিলেন উল্লেখযোগ্য শাসক।
  •  পাল যুগে সোমপুর মহাবিহার, নালন্দা, বিক্রমশীলা বিহার গড়ে ওঠে।

বাংলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক (১০৮২ - ১২০৪ খ্রি.)

​১. কৈবর্ত বিদ্রোহ (১০৮২ খ্রি.) 

  • ঘটনা: ১০৮২ খ্রিস্টাব্দে বাংলার ইতিহাসে প্রথম সফল কৃষক বিদ্রোহ নামে পরিচিত কৈবর্ত বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।কৈবর্ত, যার অর্থ একটি জাতি বা সম্প্রদায়, যারা জেলে বা কৃষিকাজের সাথে যুক্ত।

  • নেতৃত্ব: এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন দিব্য (দিব্যোক নামেও পরিচিত), যিনি ছিলেন একজন স্থানীয় সামন্ত বা কৈবর্ত সম্প্রদায়ের নেতা।

  • প্রেক্ষাপট: এটি মূলত পাল রাজা দ্বিতীয় মহীপালের দুর্বল শাসন এবং কৈবর্তদের প্রতি তাঁর কঠোর আচরণের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিল।

  • ফলাফল: বিদ্রোহীরা দ্বিতীয় মহীপালকে হত্যা করে এবং বরেন্দ্র অঞ্চলে (উত্তরবঙ্গ) কৈবর্ত শাসন প্রতিষ্ঠা করে। এই বিদ্রোহের পর বাংলায় তিনটি কৈবর্ত রাজা (দিব্য, রুদোক এবং ভীম) প্রায় এক দশক রাজত্ব করেন। পাল রাজা রামপাল পরে ভীমকে পরাজিত করে বরেন্দ্র উদ্ধার করেন।

​২. সেন বংশের উত্থান ও প্রতিষ্ঠা (১০৯৮ খ্রি.) 

  • প্রতিষ্ঠাতা: ১০৯৮ খ্রিস্টাব্দে (আনুমানিক) বিজয় সেন কর্তৃক বাংলায় সেন বংশের শাসন শুরু হয়। তিনি পাল সাম্রাজ্যের পতনশীল অবস্থার সুযোগ নিয়ে রাঢ় অঞ্চলে সেন বংশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরে সমগ্র বাংলা দখল করেন।

  • আদি নিবাস: সেন রাজাদের আদি নিবাস ছিল দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক। তাঁরা ছিলেন মূলত যোদ্ধা ও ব্রাহ্মণ।

​৩. বল্লাল সেন: সমাজ সংস্কার ও কুলীন প্রথা

  • ভূমিকা: বিজয় সেনের পুত্র বল্লাল সেন (১১৬০-১১৭৮ খ্রি.) তাঁর রাজত্বকালে দুটি প্রধান কাজ করেন:
    • 'আদর্শ সমাজব্যবস্থা' প্রবর্তন: তিনি বাংলায় একটি সুসংগঠিত সমাজ কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।

    • কুলীন প্রথা চালু: তিনি ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থদের মধ্যে 'কুলীন প্রথা' চালু করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল উচ্চবর্ণের মধ্যে কৌলীন্য (পারিবারিক মর্যাদা) প্রতিষ্ঠা করা এবং বংশের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা।

  • সাহিত্যকর্ম: বল্লাল সেন 'দানসাগর''অদ্ভুতসাগর' নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

​৪. মুসলিম শাসনের সূচনা (১২০৪ খ্রি.) 

  • শেষ সেন রাজা: লক্ষ্মণ সেন ছিলেন সেন বংশের শেষ স্বাধীন ও শক্তিশালী রাজা। তাঁর সভাতেই বিখ্যাত কবি জয়দেব তাঁর 'গীতগোবিন্দম্' কাব্য রচনা করেন।

  • পতন: লক্ষ্মণ সেনের শাসনামলেই ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১২০২-০৩ খ্রি.) তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি এক আকস্মিক আক্রমণে মাত্র ১৭ জন সেনা নিয়ে তাঁর  রাজধানী নদীয়া (বা লক্ষ্মণাবতী/লখনৌতি) অধিকার করে নেন।

  • ফলাফল: এই বিজয়ের মাধ্যমেই বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী সেন শাসনের অবসান ঘটে। তবে লক্ষ্মণ সেনের পুত্ররা বাংলার পূর্বাঞ্চলে কিছুকাল শাসন বজায় রেখেছিলেন।

একনজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। 

বিজয় সেন কর্তৃক সেন বংশের শাসন শুরু।
  • আদি নিবাস ছিল দক্ষিণ ভারত।
  •  তাঁর পুত্র বল্লাল সেন ‘আদর্শ সমাজব্যবস্থা’ প্রবর্তন করেন এবং কূলীন প্রথা চালু করেন।
  •  লক্ষ্মণ সেন ছিলেন শেষ সেন রাজা; তাঁর শাসনামলেই (১২০৪ খ্রি.) বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়।

 প্রাচীন বাংলার রাজবংশসমূহের সংক্ষিপ্ত পরিচয়।

​১. গৌড় রাজবংশ (শশাঙ্ক)

  • সময়কাল: আনুমানিক ৬ষ্ঠ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে ৭ম শতাব্দীর প্রথম ভাগ (৫৯০-৬২৫ খ্রি.)।
  • প্রতিষ্ঠাতা: শশাঙ্ক, যিনি ছিলেন প্রাচীন বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম শাসক।
  • গুরুত্ব: তিনি প্রথমবার বাংলার বিচ্ছিন্ন জনপদগুলিকে একত্রিত করে গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ (মুর্শিদাবাদ)। তাঁর শাসন উত্তর ভারতের রাজনীতিতে বাংলার প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে।
  • ধর্ম: তিনি ছিলেন শৈব ধর্মাবলম্বী।

​২. পাল রাজবংশ 

  • সময়কাল: আনুমানিক ৭৫০ খ্রি. থেকে ১১৫০ খ্রি. পর্যন্ত।
  • প্রতিষ্ঠাতা: গোপাল, যিনি মাৎস্যন্যায় (অরাজকতা) দূর করার জন্য জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন।
  • গুরুত্বপূর্ণ শাসক:
    • ধর্মপাল: পাল সাম্রাজ্যকে শিখরে পৌঁছে দেন। তিনি বিখ্যাত বিক্রমশীলা মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন।
    • দেবপাল: তাঁর সময়ে সাম্রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তার ঘটে।
  • ধর্ম ও সংস্কৃতি: পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের (মহাযান) পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের সময়ে স্থাপত্য, শিল্পকলা (ধাতু ও চিত্রশিল্প) এবং শিক্ষার বিশেষ উন্নতি ঘটে।

​৩. সেন রাজবংশ 

  • সময়কাল: আনুমানিক ১০৭০ খ্রি. থেকে ১২৩০ খ্রি. পর্যন্ত।
  • প্রতিষ্ঠাতা: সামন্ত সেন। তবে বিজয় সেন ছিলেন সেন সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।
  • আদি নিবাস: এঁরা ছিলেন মূলত দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আগত।
  • গুরুত্বপূর্ণ শাসক:
    • বল্লাল সেন: কুলীন প্রথা চালু করেন।
    • লক্ষ্মণ সেন: সেন বংশের শেষ স্বাধীন রাজা। তাঁর রাজত্বকালে বখতিয়ার খলজি বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা করেন (১২০৪ খ্রি.)।
  • ধর্ম: সেন রাজারা ছিলেন ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও হিন্দু ধর্মের (শৈব ও বৈষ্ণব) পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের সময়ে সংস্কৃত সাহিত্য ও স্মৃতিশাস্ত্রের চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়।

​৪. অন্যান্য আঞ্চলিক রাজবংশ (সংক্ষেপে)

  • খড়গ বংশ ও দেব বংশ: ৭ম থেকে ৯ম শতাব্দীতে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় (সমতট ও হরিকেল অঞ্চলে) এই স্থানীয় রাজবংশগুলি স্বাধীনভাবে রাজত্ব করত।
  • চন্দ্র রাজবংশ: ১০ম থেকে ১১শ শতাব্দীতে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় (সমতট ও বঙ্গ অঞ্চলে) শাসন করত। এই বংশের উল্লেখযোগ্য শাসক ছিলেন শ্রীচন্দ্র

 একনজরে রাজবংশ শাসনের সূচনা বিখ্যাত শাসক ও তাদের অবদান ।

  • মৌর্য খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতক অশোক প্রশাসন ও ধর্ম প্রচার।
  • গুপ্ত খ্রিস্টীয় ৪র্থ শতক সমুদ্রগুপ্ত, চন্দ্রগুপ্ত-২ শিল্প ও সাহিত্যের বিকাশ।
  • শশাঙ্ক বংশ ৬০৬ খ্রি. রাজা শশাঙ্ক প্রথম স্বাধীন বাংলা রাজ্য।
  • পাল বংশ ৭৫০ খ্রি. গোপাল, ধর্মপাল, দেবপাল শিক্ষা, বৌদ্ধ ধর্ম, স্থাপত্য।
  • সেন বংশ ১০৯৮ খ্রি. বিজয় সেন, বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেন হিন্দু ধর্ম পুনরুজ্জীবন, কূলীন প্রথা।

 অতিরিক্ত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। 

প্রাচীন বাংলার রাজধানীসমূহ:
  • পুণ্ড্রবর্ধন (বগুড়া)
  • কর্ণসুবর্ণ (মুর্শিদাবাদ)
  • গৌড় (রাজশাহী)

ধর্ম: বৌদ্ধ ধর্ম পাল যুগে সর্বাধিক বিকাশ লাভ করে।

স্থাপত্য: 

  • সোমপুর মহাবিহার (নওগাঁ)
  •  বিক্রমশীলা বিহার (বিহার)
  • মহাস্থানগড়।

ভাষা ও সাহিত্য:

 পাল যুগে প্রাকৃত ও সংস্কৃত ভাষার প্রচলন, পরবর্তীতে প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি।

গুরুত্বপূর্ণ MCQ (চাকরি ও ভর্তি পরীক্ষায় আসা প্রশ্নসমূহ)

১. বাংলার প্রথম স্বাধীন শাসক কে?
➤ রাজা শশাঙ্ক 

২. পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
➤ গোপাল 

৩. বাংলার ইতিহাসে প্রথম কৃষক বিদ্রোহ কোনটি?
➤ কৈবর্ত বিদ্রোহ 

৪. কূলীন প্রথা কে চালু করেন?
➤ বল্লাল সেন 

৫. সেন বংশের শেষ রাজা কে ছিলেন?
➤ লক্ষ্মণ সেন 

৬. সোমপুর মহাবিহার কার আমলে নির্মিত হয়?
➤ ধর্মপাল 

৭. ‘কর্ণসুবর্ণ’ কোথায় অবস্থিত?
➤ মুর্শিদাবাদ জেলায় 

৮. ‘পুণ্ড্রবর্ধন নগর’ বর্তমানে কোথায়?
➤ বগুড়া জেলার মহাস্থানগড় 

৯. বাংলার প্রথম নির্বাচিত রাজা কে?
➤ গোপাল 

১০. প্রাচীন বাংলার তিনটি প্রধান অঞ্চল কোনগুলো?
➤ বঙ্গ, অঙ্গ ও পুণ্ড্র 

গুরুত্বপূর্ণ MCQ প্রশ্ন ও উত্তর (প্রাচীন বাংলার ইতিহাস)

১. বাংলার প্রথম স্বাধীন শাসক কে ছিলেন?
a) ধর্মপাল
b) গোপাল
c) রাজা শশাঙ্ক
d) বিজয় সেন

২. পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
a) ধর্মপাল
b) গোপাল
c) দেবপাল
d) বল্লাল সেন

৩. বাংলার ইতিহাসে প্রথম কৃষক বিদ্রোহ কোনটি?
a) নীল বিদ্রোহ
b) কৈবর্ত বিদ্রোহ
c) সিপাহী বিদ্রোহ
d) ফকির বিদ্রোহ

৪. কূলীন প্রথা কে প্রবর্তন করেন?
a) লক্ষ্মণ সেন
b) বিজয় সেন
c) বল্লাল সেন
d) ধর্মপাল

৫. সেন বংশের শেষ রাজা কে ছিলেন?
a) লক্ষ্মণ সেন
b) বিজয় সেন
c) বল্লাল সেন
d) গোপাল

৬. সোমপুর মহাবিহার কার আমলে নির্মিত হয়েছিল?
a) দেবপাল
b) ধর্মপাল
c) গোপাল
d) শশাঙ্ক

৭. কর্ণসুবর্ণ কোথায় অবস্থিত ছিল?
a) রাজশাহী
b) মুর্শিদাবাদ
c) ঢাকায়
d) বগুড়া

৮. পুণ্ড্রবর্ধন নগর বর্তমানে কোথায় অবস্থিত?
a) রাজশাহী
b) নওগাঁ
c) বগুড়া (মহাস্থানগড়)
d) পাবনা

৯. বাংলার প্রথম নির্বাচিত রাজা কে ছিলেন?
a) ধর্মপাল
b) গোপাল
c) শশাঙ্ক
d) দেবপাল

১০. প্রাচীন বাংলার তিনটি প্রধান অঞ্চল কোনগুলো?
a) মগধ, পাটলিপুত্র, কামরূপ
b) বঙ্গ, অঙ্গ ও পুণ্ড্র
c) গৌড়, পুণ্ড্র ও তাম্রলিপ্তি
d) কামরূপ, রাঢ়, গৌড়

১১. রাজা শশাঙ্কের রাজধানী কোথায় ছিল?
a) গৌড়
b) পুণ্ড্রবর্ধন
c) কর্ণসুবর্ণ
d) বিক্রমপুর

১২. পাল বংশ কোন ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন?
a) হিন্দু ধর্ম
b) বৌদ্ধ ধর্ম
c) ইসলাম ধর্ম
d) জৈন ধর্ম

১৩. ‘বাংলার ইতিহাসে স্বর্ণযুগ’ হিসেবে কোন যুগ পরিচিত?
a) মৌর্য যুগ
b) সেন যুগ
c) পাল যুগ
d) শশাঙ্ক যুগ

১৪. বল্লাল সেনের সময় কোন প্রথা চালু হয়েছিল?
a) বর্ণ প্রথা
b) কূলীন প্রথা
c) জমিদার প্রথা
d) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

১৫. লক্ষ্মণ সেনের সময় বাংলায় কার আগমন ঘটে?
a) মুহাম্মদ বিন কাসিম
b) ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি
c) কুতুবউদ্দিন আইবেক
d) আলাউদ্দিন খলজি

নিচে সঠিক উত্তরগুলো দেওয়া হলো:

১. সঠিক উত্তর: c) রাজা শশাঙ্ক
২. সঠিক উত্তর: b) গোপাল
৩. সঠিক উত্তর: b) কৈвартবিদ্রোহ
৪. সঠিক উত্তর: c) বল্লাল সেন
৫. সঠিক উত্তর: a) লক্ষ্মণ সেন
৬. সঠিক উত্তর: b) ধর্মপাল
৭. সঠিক উত্তর: b) মুর্শিদাবাদ
৮. সঠিক উত্তর: c) বগুড়া (মহাস্থানগড়)
৯. সঠিক উত্তর: b) গোপাল
১০. সঠিক উত্তর: b) বঙ্গ, অঙ্গ ও পুণ্ড্র
১১. সঠিক উত্তর: c) কর্ণসুবর্ণ
১২. সঠিক উত্তর: b) বৌদ্ধ ধর্ম
১৩. সঠিক উত্তর: c) পাল যুগ
১৪. সঠিক উত্তর: b) কূলীন প্রথা
১৫. সঠিক উত্তর: b) ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি


উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ও দিল্লি সালতানাত (৭১২ – ১৫২৬ খ্রি.)


ইসলামের আগমন উপমহাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক যুগের সূচনা করে।

  • ১. প্রথম ইসলামী আক্রমণ ও প্রতিষ্ঠা (৭১২ খ্রি. ইত্যাদি)।

     মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয় (৭১২ খ্রি.)

  • সময়কাল ও ঘটনা: ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে আরবদের সিন্ধু বিজয়।
  • নেতৃত্ব: আরবের উমাইয়া খিলাফতের সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম
  • বিজিত অঞ্চল: সিন্ধু প্রদেশের রাজধানী দেবল এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর মুলতান
  • পরাজিত শাসক: সিন্ধুর হিন্দু রাজা দাহির
  • তাৎপর্য: এটি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম সফল ও স্থায়ী মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা।

  • সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব 

    • ধর্মীয় নীতি: কাসিম বিজিত হিন্দু-বৌদ্ধদের 'জিম্মি' বা সংরক্ষিত মর্যাদা দেন এবং তাদের ওপর 'জিজিয়া' (Jizya) কর আরোপ করেন (যা ভারতে প্রথম)।

    • বাণিজ্যিক গুরুত্ব: সিন্ধু বিজয় মূলত ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য পথকে আরবদের জন্য নিরাপদ করে তোলে।

    • জ্ঞান বিনিময়: এই সময়েই ভারতের গণিত (বিশেষত 'শূন্য'দশমিক পদ্ধতি), জ্যোতির্বিজ্ঞানআয়ুর্বেদ আরবের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।


 তুর্কি-আফগান আক্রমণ ও সাংগঠনিক পরিবর্তন

১. মুহাম্মদ ঘোরির বিজয় (১১৯২ খ্রি.)

  • ভূমিকা: তুর্কি-আফগান আক্রমণের মূল ভিত্তি স্থাপন করেন মুহাম্মদ ঘোরি (মূলত শিহাবুদ্দিন মুহাম্মদ)। তিনি ছিলেন বর্তমান আফগানিস্তানের ঘোর অঞ্চলের শাসক।

  • প্রথম আক্রমণ ও পরাজয় (১১৯১ খ্রি.): প্রথমদিকে তিনি প্রথম তরাইনের যুদ্ধে (১১৯১ খ্রি.) পৃথ্বীরাজ চৌহানের কাছে পরাজিত হন।

  •  বিজয় (১১৯২ খ্রি.):পরের বছর দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধে (১১৯২ খ্রি.) তিনি রাজপুত জোটকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। এই জয় ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসে এক টার্নিং পয়েন্ট, কারণ এটি উত্তর ভারতে একটি সুসংগঠিত তুর্কি সাম্রাজ্যের পথ খুলে দেয়।

  • গুরুত্ব: সিন্ধু বিজয়ের (৭১২ খ্রি.) বিপরীতে, ঘোরির বিজয় মধ্য এশিয়ার তুর্কি-আফগানদের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশে স্থায়ী রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেয়।


২. বাংলায় মুসলিম শক্তির প্রসার: বখতিয়ার খলজি (১২০৪ খ্রি.)

  • নেতৃত্ব ও অভিযান: মুহাম্মদ ঘোরির অন্যতম সেনাপতি ছিলেন ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি। তিনি বিহার ও বাংলায় তুর্কি অভিযান পরিচালনা করেন।

  • নদীয়া বিজয় (১২০৪ খ্রি.): তিনি অতর্কিতভাবে নদীয়ার (নদিয়া) সেন রাজা লক্ষ্মণসেনের রাজধানী আক্রমণ করেন এবং তা জয় করেন। যদিও তাঁর সম্পূর্ণ বাংলা জয় নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে এর মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়।

  • সংগঠন: বখতিয়ার খলজি পরবর্তীতে বাংলার নতুন রাজধানী লখনৌতি (গৌড়) প্রতিষ্ঠা করে সেখানে একটি স্বাধীন বা অর্ধ-স্বাধীন মুসলিম প্রশাসন গঠন করেন।

৩. দিল্লি সালতানাতের সূচনা (১২০৬ খ্রি.)

  • রাজনৈতিক পটভূমি: মুহাম্মদ ঘোরির কোনো পুত্র ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পর (১২০৬ খ্রি.), তাঁর প্রধান সেনাপতি এবং ভারতের দায়িত্বে থাকা দাস-কর্মকর্তারা ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

  • প্রতিষ্ঠাতা: ঘোরির অন্যতম প্রধান 'দাস-সেনাপতি' কুতুবউদ্দিন আইবেক ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে নিজেকে দিল্লির স্বাধীন শাসক হিসেবে ঘোষণা করেন।

  • প্রতিষ্ঠা: এর মাধ্যমেই ভারতীয় ইতিহাসে 'দিল্লি সালতানাত' (Delhi Sultanate) এবং প্রথম রাজবংশ 'দাস রাজবংশের' (মামলুক রাজবংশ) সূচনা হয়।

  • ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এই সালতানাত প্রায় ৩২০ বছর ধরে (১২০৬-১৫২৬ খ্রি.) দিল্লি থেকে উপমহাদেশে শাসন করে এবং এটিই প্রথম সর্বভারতীয় মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে, যা প্রশাসনিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনে।

এই তিনটি ঘটনা (দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধ, নদীয়া বিজয় এবং দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠা) ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামী শাসনের সাংগঠনিক ও আঞ্চলিক বিস্তৃতির মূল ভিত্তি স্থাপন করে।

 


৩. দিল্লি সালতানাতের প্রতিষ্ঠা ও আদিম কাঠামো।


  • ১২০৬ খ্রিঃ-এ কুতুবউদ্দিন আইবেক দিল্লিতে প্রথম সুলতান হিসেবে শাসন করেন। 
  • তাঁর শাসনকে ‘মামলুক বা স্লেভ্ (Slave) বংশ’ বলে চিহ্নিত করা হয়। 
  • ওই সময় থেকেই উত্তর ভারতের রাজনীতিতে মুসলিম সুলতানদের দৌর শুরু হয় — প্রশাসনিক, স্থাপত্যিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক পরিবর্তন আসে।
  • এই যুগের লক্ষ্য হলো শুধুই জয় নয়, বরং শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি ও ধর্মীয় সংমিশ্রণ।


৪. পরীক্ষা-ভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-বিন্দু।

  • ইসলাম উপমহাদেশে কীভাবে প্রবেশ করলো — সামরিক জয়, বাণিজ্য, ধর্মীয় মিশন।
  • সিন্ধু অভিযান (৭১২ খ্রি.) ও তার ফলাফল।
  • দ্বিতীয় তরাইন যুদ্ধ (১১৯২ খ্রি.) ও তার প্রভাব।
  • বাংলার তত্ত্বাবধানে মুসলিম আগমন ১২০৪ খ্রি.
  • দিল্লি সালতানাতের শুরু এবং তার প্রথম সুলতান।

প্রথম মুসলিম শাসকদের প্রশাসনিক পরিবর্তন ও স্থাপত্য উদাহরণ।

 MCQ প্রশ্ন ও উত্তর (উপরোক্ত বিষয়ভিত্তিক)


১. নিচের কোনটি উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের প্রথম বৃহৎ পদক্ষেপ ছিল?

a) কুতুবউদ্দিন আইবেকের দিল্লিতে সুলতান ঘোষণা

b) মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু জয়

c) ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ারের নদীয়া জয়

d) মুহাম্মদ ঘোরির দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধ

উত্তর: b


২. কুতুবউদ্দিন আইবেক ১২০৬ খ্রিঃ এ কি কাজ করেছিলেন?

a) বাংলায় মুসলিম শাসন শুরু

b) সিন্ধু জয় করেছিলেন

c) প্রথম দিল্লি সুলতান হয়েছিলেন

d) দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধ পরিচালনা করেন

উত্তর: c


৩. সিরিজ দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধে (১১৯২ খ্রি.) কে পরাজিত হয়েছিলেন?

a) রাজা দাহির

b) পৃথ্বীরাজ চৌহান

c) ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ারে

d) কুতুবউদ্দিন আইবেক

উত্তর: b


৪. নিচের কোন বংশ দিয়ে শুরু হয় দিল্লি সালতানাতের শাসন?

a) খিলজি বংশ

b) তোঘলক বংশ

c) স্লেভ (মামলুক) বংশ

d) লোদি বংশ

উত্তর: c


৫. মুসলিম শাসনের প্রথম প্রভাব কোন এলাকায় দেখা দিয়েছে?

a) বাংলায়

b) গুজরাতে

c) সিন্ধু ও বাংলাদেশ উভয়ে

d) সিন্ধু উপনদীতে

উত্তর: d



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন